দারিদ্র্য নির্মূলে বেসরকারি খাত ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন

| মঙ্গলবার , ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:১৯ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার ও দরিদ্রের সংখ্যা উভয়ই বাড়ছে। ২০২৫ সালের ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির নানা সূচকে কার্যত যে স্থবিরতা রয়েছে তারই ফলাফল এটি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পর্যাপ্ত উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা রাখে। কারণ এগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সময়ের পরিক্রমায় দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলোর পরিস্থিতি ক্রমেই নিম্নমুখী হয়েছে এবং এ প্রবণতা বজায় আছে। ফলে সংগত কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্তর আরো স্ফীত হচ্ছে, বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সব মিলিয়ে মানুষ দরিদ্র হচ্ছে এবং দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে বাস করছে।

এতে আরো বলা হয়েছে, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকার নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। ভর্তুকি, ভাতার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির তুলনায় এগুলোর পরিমাণ যথেষ্ট নয়। আবার প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি না পৌঁছার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি সরকারের দেয়া সুযোগ–সুবিধা পেতে গিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীরা নানা ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিই যদি এমন হয়ে থাকে এবং ভবিষ্যতে আরো মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ে তাহলে কেবল সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়া যে যাবে না তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তার পরও সাময়িক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো অর্থনীতির উৎপাদনশীল সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় বের করা। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করা। তা না হলে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও জনজীবন দুটোই ধুঁকে ধুঁকে চলবে এবং ভবিষ্যৎ আরো নাজুক হয়ে উঠবে।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, কয়েক বছর ধরে একটা ধারাবাহিক সংকটজনক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের আয়–ব্যয়, দারিদ্র্য পরিস্থিতি ও অন্যান্য খাতে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষুদ্র অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। তবে অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি (পিপলস লেন্স) থাকা খুবই জরুরি হয়ে গেছে। শুধু জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ওপর আলোচনাটা সীমাবদ্ধ না রেখে সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিকের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে। দরিদ্রের বাইরে এখন দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামপ্রতিক বছরগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়েছে। খাবার, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও শিক্ষা–এমন প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে পারছেন না। বর্তমান বাস্তবতায় নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

গবেষণায় এসেছে, সমাজের একটি অংশ অনেক বেশি আয় করছে, অন্যদিকে বড় অংশ খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে পরিবারগুলোর ওপর ঋণের চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে চাপ বেশি। এই ঋণ মূলত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যয়, চিকিৎসা কিংবা ঘর মেরামতের মতো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঋণ করছেন দৈনন্দিন খাবারের খরচ মেটানোর জন্য। ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরেকটি বড় ঝুঁকি। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র অনেক পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে একাধিক বেলা কিংবা মাসে অন্তত এক দিন একেবারেই না খেয়ে থাকছেন। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এখনো ব্যাপক আকারে হয়নি, তবে তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটি উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্প্রতি অনেক অনুসন্ধানে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। শিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধির ফলে শিক্ষার মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসের সম্ভাবনা কমেছে। শুধু তা–ই নয়, বিগত কয়েকটি শ্রমশক্তি জরিপ থেকে দেখা যায়, অধিকাংশ পেশায় গত কয়েক বছরে প্রকৃত মজুরি কমে গেছে। যেসব পেশায় উচ্চশিক্ষা দরকার সেখানেও কমেছে। সুতরাং দারিদ্র্য হার বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। দারিদ্র্য নির্মূলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে