দুজন নারীপুরুষ যখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন একজনের ভালোলাগাকে আরেকজনের সম্মান দেয়া উচিত। প্রতিটি মানুষের মুখাবয়বের মতো তাদের মনটাও ভিন্ন এবং মনের চাওয়াটাও ভিন্ন। একজনের হয়তো পাহাড় ভালো লাগে কিন্তু আরেকজন পছন্দ করে সাগর। একজন ঘরকোণো হলে আরেকজন হতে পারে ভ্রমণপিপাসু। সাদামাটা আটপৌরে জীবনযাপনেই সন্তুষ্ট থাকা মানুষটির সঙ্গীটি হতে পারে উচ্চভিলাসী। কারো ভাত পছন্দ, কারো রুটিতেই তৃপ্তি। এতকিছুর অমিল হওয়ার পরও তো দুটো মানুষ একটি সংসারে সারাজীবন একসাথে সুখে দুঃখে কাটাতে পারে। যদি একজনের পছন্দ অপছন্দকে আরেকজন ভালোবেসে গুরুত্ব ও সম্মান দেয়। নিজের সাথীটিকে বিশ্বাস ও আস্থায় চলার অসমতল পথকে মসৃণ ও স্বাধীন করে দেয়। বিশেষ করে দুজন দুজনার মনের খবর রাখে এবং সম্পর্কের যত্ন নেয়।
এক্ষেত্রে বেশিরভাগ পুরুষেরাই স্বামীত্বের অধিকারে স্ত্রী নারীটির চলায়, বলায়, লেখায়, পড়ায়, বলতে গেলে নারীর সকল মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করে অদৃশ্য এক প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তুলে দেয়। খুব সূক্ষ্মভাবে নারী স্বাধীনতায় বাধ সাধে। অন্যদিকে বেশিরভাগ নারী এসব বিষয়ে কমেপ্রামাইজ করে চললেও পুরুষ একচুল ছাড় দিতেও নারাজ। যেমন– আমার দেখা অনেক নারী লেখক আছেন যারা লিখতে ভালোবাসেন কিংবা না লিখতে পারলে কষ্ট পান। বেশ ভালো উচ্চারণে আবৃত্তি করতে পারেন কিন্তু তাদের স্বামী লেখালেখি কিংবা আবৃত্তি করাটা একদমই পছন্দ করেন না বলে, তারা লিখতে পারছেন না, আবৃত্তি কিংবা সঞ্চালনা করা তো বহুদূরের কথা! এইসব নারী কষ্টে আছেন এবং নিজের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করতে না পারার গোপন কষ্টে ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছেন এবং ডিপ ডিপ্রেশনে ভুগছেন। ওই স্বামীরা হয়তো বুঝতেই শিখেনি লেখালেখিটা আসলে বিলাসিতা নয়, কোনো শখও নয়। লেখকের সৃষ্টিশীল মন এবং মস্তিষ্কই তাকে লিখতে তাড়না দেয়। তখনই লেখক লিখতে বাধ্য হন, লিখতে না পেরে অদৃশ্য একটা যন্ত্রণায় ভোগেন। পৃথিবীতে সবকিছুর শিক্ষক থাকলেও লেখালেখির কোনো শিক্ষক নেই। এটা আসলে আল্লাহ প্রদত্ত একটি গুণাবলী। বড় বড় ডিগ্রীধারীও হয়তো অনেক চেষ্টায় দুই চার লাইন লেখার ক্ষমতা রাখে না। এই কথাগুলো ওই প্রভুত্ব খাটানো স্বামীদেরকে কে কীভাবে বোঝাবে? নারীর লেখালেখির ক্ষেত্রে এই বিশাল প্রতিবন্ধকতা কে কবে দূর করবে কিংবা আদৌ এই প্রতিবন্ধকতার দ্বার ঘুচবে কি না কে জানে! একজন সংসারী নারীর লেখালেখি করে তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নপূরণের ইচ্ছে থাকাটা কোনো অপরাধ নয়। বরং এটা নারীর মৌলিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
নদী ও নারীর মধ্যে অদৃশ্য একটা মিল রয়েছে। একটি নদী যেমন বারবার কূল ভাঙনের কষ্ট ও উতলা ঢেউয়ের শব্দ, পথচারীদের বর্জ ও আবর্জনার দুর্গন্ধের অবহেলার গল্প, অকারণ তাচ্ছিল্যের ইতিহাস তার জলরাশির গহীনে নীরবে লুকিয়ে রেখেও আপন স্রোতধারায় অবিরাম বয়ে চলে, তেমনি নারীও নদীর মতোই পুনঃপুন ভাঙনের ইতিহাস বাঁ–পাঁজরে গোপনে লুকিয়ে রেখেও অনিচ্ছায় হাসে। তার হাসির অন্তরালে হৃদয়ে কত না পাওয়ার অভিমান অনুচ্চারিত অভিযোগে বদলায়! তবু নারী নীরবেই জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। অনুযোগহীন এই পথচলায় নারীর মনের খবর কেউ–ই রাখে না; রাখে না তার ভেতরে প্রতিদিন কতশত কল্পিত স্বপ্ন কিংবা দুরন্ত ইচ্ছেরা অপূর্ণতার যন্ত্রণায় ডানা ঝাপটে অবশেষে আত্মহননে বুকের গহীনেই সমাধীত হয়। দূর থেকে দেখলে প্রতিটি গাছের পাতা সবুজ দেখালেও একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ওপরে তাকালেই বোঝা যায়, আসলে ওপরের গাছটিতে কতগুলো পাতা হলদে কিংবা শুকিয়ে মলিন হয়ে আছে। তেমনি ব্যক্তিজীবনে অনেক নারীকে কর্পোরেট জবে অনেক শিক্ষিত ও স্মার্ট দেখালেও, আসলে সে নারীর হৃৎপিণ্ডও কতটা অপূর্ণতার ব্যথায় ক্ষয়ে যাচ্ছে সেটা অগোচরেই থাকে। বর্তমান যুগেও নারী কোনো গল্প উপন্যাসের পৃষ্ঠা নয়, বরং প্রতিটি নারীই এক একটি উপাখ্যান।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক












