‘গ্রানাডা শপিংমলের পার্কিংলটে আমার গাড়ি পাশে এসে থামা লাল পোর্সে থেকে নামা মেয়ে দুটোকে দেখেছিলে?’ হুম, দু’জন না তিনজন দেখেছি। তবে আবায়ার নীচে কে যে ছিল ওরা? তা জানি না। ‘আরে শেষে যেটা নেমেছে ওটা দাসি। আবায়া দেখেই বোঝা যায়। আমি বলছি বাকী দুজনের কথা।’ কম শুনিনি এখানে আসার পর, সৌদিদের দাসিবিষয়ক সমাচার। অথচ ফাহাদ দেখছি দাসিকে গোনাতেই ধরছে না! ব্যাপার কী? ‘শোন আবায়া পড়ুক আর যতো যাই কাপড় প্যাঁচিয়ে রাখুক, কিচ্ছু যায় আসে না। আরে বুঝলে না সবার আগে, ঐ যে লাফিয়ে নামলো যে আর কী, ও কিন্তু একটা ডবকা যুবতি। আবায়ার উপর থেকেই বুঝতে পারি আমি রমণীর যাবতীয় বাঁক ও সঠিক স্থানের উচ্চতা, স্বাস্থ্য’– বলেই ফাহাদ সরাসরি গেল ঢুকে সেই আবায়ার অন্দরে।
অতপর রসিয়ে রসিয়ে, যা বলতে শুরু করলো ইংরেজি আরবি মিলিয়ে, তার সার্থক বঙ্গানুবাদ করলে, আমার কৈশোরে তারুণ্যে, বাংলার ফুটপাতে, রেলস্টেশনে, বাসট্যান্ডে, লঞ্চ টার্মিনালে লুকিয়ে চুরিয়ে বিক্রি হওয়া, রসময় গুপ্তের চটি যাবে ডাহা মার খেয়ে। নাহ, হারিয়ে গেছে কৈশোরের, নবতারুণ্যের সেই নিষিদ্ধ উত্তেজনা। অস্বস্তি লাগছে বড়ই। বিবমিষার ভাবও হচ্ছে। তারপরও এই বাঙ্গালের পৌরুষ রক্ষার খাতিরে, ফাহাদ যে নারী ও যৌনতা বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ, এ নিয়ে কাটলাম দুয়েকটা ফোঁড়ন।
এই ফাহাদ, তুমি না বলেছিলে মরুর হাইওয়েতে উট দাঁড়িয়ে থাকলে, উটের ভারী শরীর যেহেতু থাকে গাড়ি চালকদের চোখের লেভেলের উপরে, তাই ওরা তা দেখতে পায় না। তদুপরি উটের গায়ের রং মরু বালির পুলিশি রঙের সাথে একাকার হয়ে ঘটায় আরেক দৃষ্টিবিভ্রম। ফলাফল মারাত্মক দুর্ঘটনা। এখন যদি সামনে পড়ে এক বা একধিক উট তবে, হবেটা কী? তুমি যে এক্সপার্ট, তাতে বেহেস্তে গিয়ে তুমি ৭২ হুরের এখনি দখল নিতে চাইলেও, আমার কিন্তু আছে বউ বাচ্চার মায়া।
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতই কাটল হঠাৎ উদয় হওয়া উদ্বেগ তাতে। দ্রুত নেমে এল কাঁটা ১০০র ঘরে। স্পিড অবশ্য এমনিতেই তাকে কমাতেই হতো। কারণ ঐ তো সামনে এই হাইওয়ের ডান দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হালকা হলুদ আর বাদামি রঙের বেশ কিছু ডুপ্লেক্স বাড়ি। এসেছি কি তবে কোন মরু থানা বা উপজেলায় হেড কোয়ার্টারে?
ঠিক তখনই জানাল ফাহাদ “মি. সেলিম এই যে দেখ, খুব বেশি দূর না। ঐটা হল একটা গ্রাম’। আরে বলে কি! ইয়ার্কি মারছে নাকি ফাহাদ? মরুর গ্রাম বলতে মনে যে ছবি আঁকা আছে ছোটবেলা থেকে, তা হল খেজুরগাছবেষ্টিত মরুদ্যানের ভেতরে সারি সারি তাঁবু। আছে ওখানে খেজুর পাতার ছাউনি দেয়া পাথুরে ঘরও কিছু। ঘর ও তাঁবুগুলোর ফাঁকে ফাঁকের খেজুর গাছের, সাথে বাঁধা উট, দুম্বা ঘোড়া। এ ছাড়াও আছে কিছু উট, দুম্বা। হাঁটছে যেগুলো ইতিউতি।
গ্রামের মাঝখানে পানির কুপ! আপাদমস্তক কারুকাজমণ্ডিত কাপড়ে মুড়িয়ে, কলসি নিয়ে কূপের চারদিকে জড়ো হয়েছে বেদুঈন লাইলিরা। তাদের সাথে আসা বাচ্চা করছে হৈ হল্লা, দৌড়ঝাঁপ।
এখানে দেখছি সবই আধুনিক ডুপ্লেক্স দালান। সুনশান চারদিক। এদিকে ওদিকে দু চারটা খেজুর গাছ থাকলেও দেখছি না, উট বা দুম্বা। প্রতিটি বাড়ির সাথেই পার্ক করা গাড়ি। ছাদে ছাদে বসানো পানির ট্যাঙ্ক। বাড়িগুলোর ছোট ছোট নানান জানালার পাশে লাগানো, এয়ারকুলার।
না, যা কিছুই দেখছি তার সাথে মনের ছবির মিলছে না, কিছুই। এ তো পুরোই আধা শহুরে অবস্থা। তবে রিয়াদ, দাম্মাম, জেদ্দা ইত্যাকার শহরগুলোর বড়িগুলোর তুলনায় এগুলোর চেহারা বড়ই মলিন ও গরিবি হালের। গাড়িগুলোও পুরানো মডেলের। বেশিরভাগই পিকআপ জাতীয়। দেয়ালে লাগানো এয়ারকুলারগুলো এতোই পুরানো যে, ওগুলো আসলে চলতশক্তিহীন হয়ে পড়েছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন?
ফাহাদ কি বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছে নাকি? না কি, এ হচ্ছে পেট্রোডলারের জোরে, আধুনিক টেকনলজির যোগসাজশে আসলেই আমূল বদলে যাওয়া সৌদি গ্রাম। ধন্দে পড়ে গেলাম বড়ই। ঘটনা যাই হোক এতদূর এসেই পড়েছি যখন, তথাকথিত এই গ্রামটি আরেকটু খুটিয়ে দেখেই তবে ফিরবো রিয়াদে। বললাম তাই, চল যাই কাছে।
নাহ, আশাহত হতে হয়নি। হাইওয়ে থেকে ডানে নেমে, কালো পিচের কার্পেটিং করা না হলেও, ইটের সোলিং করা মোটামুটি মানের ভাল পার্শ্বরাস্তা ধরে এগিয়ে, ডুপ্লেক্স বাড়িগুলোর কাছে গিয়ে একটু ফাঁকায় গাড়ি পার্ক করে, দুই বাড়ির মাঝের রাস্তা দিয়ে হেঁটে কিছুদূর এগুতেই, পড়লো চোখে বেশ কটা, মেটে রংয়ের একতলা বাড়ি। ছাদের রেলিংয়ের উপরটা সাদা রং দেয়া। জানালাগুলোর কাঠের জানালার চৌকাঠও সাদা রং। সবুজ কিছু ক্ষেত খামার, আর সারি সারি নানান বয়সী খেজুর গাছ মিলে, গ্রাম, গ্রাম ভাব চোখে পড়ছে। চৌকো আকারের মেটে রঙ্গয়ের দেয়ালের বাড়িগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞে করি, কিসের তৈরি এগুলো? ‘কাদামাটি।’ শুধুই কাদামাটি? এই বালির সাগরে এতো কাদামাটি পেলো কোথায়? ‘এখানে বালি কোথায় অতো। বালির মধ্যে গ্রাম হবে কি করে। চাষাবাদই কী হয় নাকি বালিতে? পাচ্ছ না টের, পায়ের নীচে শক্ত মাটির? একটু দূরের সবুজ ক্ষেতগুলোর দিকে ভাল করে তাকাতেই, চোখে পড়লো ঐগুলোর ঐপাশে, বেশ বড় আকারের সাদা পলিথিন নাকি কাঁচ মোড়ানো, অর্ধচন্দ্রাকৃতি বিশাল আকারের ঘরগুলোর দিকে। গ্রিন হাউজ হবে নিশ্চয়।‘বুঝলে, ঐ যে সাদা ঘরগুলো দেখছ ওগুলোর মধ্যে সব্জি চাষাবাদ হয়। দেখো গিয়ে, ক্ষেতে যারা কাজ করছে, তারাও তোমার দেশী বন্ধুই।’ আমার ভাইয়েরা যে এখানে, বাংলাদেশী সব্জিও ফলিয়ে ছেড়েছে, তা আমি টের পেয়েছি বাথার বাজারে গিয়ে। আচ্ছা, চল যাই, ঐ ক্ষেতগুলো দেখি। গ্রিনহাউজে নিশ্চয় ঢোকা যাবে না, কিন্তু মরুর এই চরম আবহাওয়ায়, কোন সেই সব্জি হচ্ছে খোলা আকাশের নীচে, তা একটু দেখে আসি।
জমিটিকে বলা চলে অনেকগুলো উঁচু আইলের সমাহার। আইলগুলোর মাঝে মাঝে চওড়া ড্রেন। যদিও পানি নাই এমুহূর্তে ড্রেনগুলোতে, তবে সেচের জন্যই যে ওগুলোকে করা হয়েছে, তা বুঝতে কৃষি বিজ্ঞানী হওয়া লাগে না। আইলের উপর জন্মানো কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেগুন গাছ গুলো দেখে, শৈশবে চাঁদপুরের গ্রামের বাড়ির ঘরের পাশের খালি জায়গায় করা বেগুন খেতটির ছবি ভেসে উঠলো চোখে।
আরে, ওগুলো কী? হুম, ফুল দেখে ঢেঁড়স গাছই মনে হচ্ছে। তবে ঢেঁড়সের সাইজ এক্কেবারে বামনাকৃতির। রিয়াদে আসার পর, প্রথম তিন সপ্তাহের মতো যে ম্যারিয়টে ছিলাম, প্রতি বেলাতেই রেস্টুরেন্টে বাবা গানুজ নামে বেগুন ভর্তা, আর বামিয়া নামের ঢেঁড়স টমেটোর ঝোলের উপস্থিতির গেল বোঝা মাজেজা এবার।
‘মিঃ সেলিম, ঐ যে একটা ডিপটিউব ওয়েলের ঘর দেখা যাচ্ছে। চল ঐখানে গিয়ে একটু দাঁড়াই। ছায়া আছে ওখানে?’
এই ডিপ টিউবওয়েলের পানি কি বাড়ি বাড়ি সাপ্লাই হয়? নাকি এ শুধু চাষাবাদের পানির যোগান দেয়?
‘দুটোই।’ ঐদিকে যেতে যেতে, পেলাম দেখা ভুট্টা ক্ষেতের। নাহ ভুট্টা গাছ, বেগুন ঢেঁড়স গাছের মতো অতো জাদরেল না, মনে হচ্ছে। মরুরোদের তেজে, শুকিয়ে খড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আচ্ছা ভুট্টা গুলোরই কী একই অবস্থা হয়েছে নাকি? তাহলে তো বিরাট ক্ষতি হয়েছে এই কৃষকের। আরে নাহ, তা হবে কেন? এই সব ফসলী ঊদ্ভিদের জীবন তো এক মৌসুমি। ফসল পাকার সাথে সাথেই মানে, আমাদের মত খাদকদের জীবন বাঁচানোর রসদের যোগান দিয়েই, হয় ওগুলোর জীবনাবসান।
বেশ কয়েকটা ভাঙ্গা পরিত্যক্ত বাড়িও পড়লো চোখে। পুরোপুরি মাটির ঘর দেখলাম যেমন, তেমনি মাটি ও পাথর মিশিয়ে তৈরি বাড়িও দেখলাম। ভেঙে পড়া ছাঁদের করি বর্গাগুলো কাঠের।
আরেহ, ঐটা তো দেখছি চমৎকার একটা মসজিদ! তাও মাটির তৈরি! আচ্ছা সৌদি রাজা, তেলের টাকায় এখানে একটা পাকা মসজিদ করে দেয় নি কেন? নিজ দেশ বাদ দিয়ে , আছেন উনি আমাদের দেশে নানান এনজিও মারফত মসজিদ বানানো নিয়ে। প্রায়শই ঐ এনজিও গুলোর ব্যাপারে নানান সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। চালায়ও ওগুলো ৭১ এর বিরোধিতাকারীরা। অবশ্য সৌদি নিজেই তো ছিল ফাকিদের সেই গণহত্যার তুমুল সমর্থক।
‘ঐ যে, ঐ যে দেখ উটের খামার। তার পাশেই ছাগল আর দুম্বার, খামার। এই যে এখানে ঘাসের ক্ষেতে কাজ করছে তোমার দুই বন্ধু। ডাকি তাদের। কথা বলে দেখো ওদের সাথে।’
মাথায় কাপড় বাঁধা অবস্থায় সৌদি তোব জাতীয় লম্বা ময়লা জামা পরা খোঁচা খোঁচা দাড়িসমৃদ্ধ লোক দুটো ঘাস কাটছিল এক মনে। ফাহাদের হাঁকডাকে উঠে এলো। রোদে পোড়া চেহারাদুটো কাস্তে হাতে কাঁচুমাঁচু দাঁড়ালো, সামনে।
কথা যা হল, ফাহাদের সাথেই। পড়েছে তার আশায় গুড়ে বালি। লোক দুজনের একজন পাকিস্তানি আরকেজন ভারতের গুজরাটের। উর্দু ও হিন্দির বিদ্যার জাহাজ এ কেলো ভূতো বাঙ্গাল। পারলাম না চালাতে কথা খুব একটা। ফাহাদই করলো সে শূন্যস্থান পূরণ, আরবিতে। তবে তার আগে, বাংলা ইংরেজি উর্দু হিন্দির ভজঘট পাকিয়ে, বলা কথায় জেনেছি, পাকিস্তানি জন এসেছেন সৌদিতে ১৮ বছর আগে। গুজরাটি ভায়ার সৌদিবাসের হয়েছে ১৪ বছর। এই গ্রামে, এই কাজে আছেন তারা বছর তিনেক, এক সাথে। দুজন নাকি বন্ধু। থাকেনও একই ঘরে।
ভাবছি, এ তো এক মজার বিষয়। ভাইরে, তোমাদের দুই দেশের সীমান্তের খাকিরা সারাক্ষণ একে অন্যের দিকে আছে সঙ্গিন উঁচিয়ে। আর ক্যান্টনমেন্টের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা, বড় খাকিরা সারাক্ষণই খুঁজছে তরিকা, ঐ উদ্যত সঙ্গিনগুলোতে মুখে বারুদ ফোটানোর। আর তোমরা দুজন কি না এই খড় খড়ে খাকিপ্রাঙ্গণে কাটছ ঘাস, কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে! ‘আসসালা মুআলাই কুম। ইয়াক হালা ওয়া মারহাবা। হায়াক আল্লাহ’। ‘আল হামদুলিল্লাহ আলা আল সালামা।’
কেউ কারো কথাই শুনছে না পুরো। বরং ক্রমাগত দুজনেই উচ্চারণ করে চলেছেন ঐসব শব্দাবলী।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।













