চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, আমরা সবাই চাই দেশটা সুন্দর ও উন্নত হোক। কিন্তু আমি নিজেকে প্রশ্ন করি–দেশকে উন্নত করার জন্য আমি কী করছি? আমার অবদান কী? দেশ ও সমাজের পরিবর্তনে আপনার অবদান কী–এই প্রশ্নটি আপনাদের কাছে রেখে যেতে চাই।
গতকাল শুক্রবার জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস–২০২৬ উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, দেশ ও সমাজের পরিবর্তন চাইলে অন্যকে দোষারোপ না করে প্রত্যেককে নিজের ভূমিকা ও অবদান নিয়ে ভাবতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি ভোক্তার পরিবর্তিত চাহিদা বুঝে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। খবর বাংলানিউজের।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ক্রেতার চাহিদা বুঝে আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, আমরা যদি ক্রেতাকে বুঝতে না পারি, সেই গবেষণা যদি আমাদের না থাকে, তাহলে বাজারে টিকে থাকতে পারব না। বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সফল প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতের ভোক্তার রুচি ও চাহিদা নিয়ে আগাম গবেষণা করে। তরুণ প্রজন্মের পছন্দ কীভাবে বদলাচ্ছে, ভবিষ্যতে তারা কী চাইবে–এসব বিবেচনায় নিয়েই পণ্য ও বাজার পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে দেশ ও বাজারগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের চিন্তাভাবনাকেও সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
পরিবর্তনের প্রতি অনীহাকে অগ্রগতির একটি বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, নতুন কিছু করতে গেলে সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জ আসবে। সেই ভয়ে প্রচলিত ধারা আঁকড়ে থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমরা পরিবর্তন পছন্দ করি না। যেভাবে চলছে, সেভাবেই ধরে রাখতে চাই। কারণ পরিবর্তন করতে গেলে সমালোচনা ও নানা চ্যালেঞ্জ আসে। চ্যালেঞ্জ ছাড়া বড় অর্জন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রচলিত চিন্তার বাইরে যেতে হবে। নতুন ধারণা গ্রহণ করতে হবে, বাড়াতে হবে সৃষ্টিশীলতা।
চট্টগ্রামের ব্যবসা–বাণিজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে জেলা প্রশাসক বলেন, দেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রামের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। সে কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছেও মানুষের প্রত্যাশা বেশি। তিনি বলেন, মানুষ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করে। তারা নতুন ধারণা নিয়ে আসবেন, নতুন কিছু সৃষ্টি করবেন। সৃষ্টিশীলতা আসতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যবসায়ীদের ক্রেতার চাহিদা, তরুণ প্রজন্মের রুচি ও ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দেন তিনি।
দেশ ও সমাজের পরিবর্তনে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়িত্বের কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, সময় শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজ ও দেশের জন্যও কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সমাজ ও দেশের পরিবর্তন চাই। কিন্তু আমি যদি দেশের জন্য না ভাবি, তাহলে সেই পরিবর্তন কীভাবে হবে? সমাজের সব সমস্যার জন্য শুধু প্রশাসনকে দায়ী করার মানসিকতা থেকেও বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, সমাজের প্রতি আমার নিজের অবদান কী, সেদিকে আমরা তাকাই না। শুধু বলব–ডিসি সাহেব এটা করেননি, এসপি এটা করেননি–এভাবে সমাজ পরিবর্তন হবে না। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিক–সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে।
বাংলাদেশের উর্বর ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে উন্নতি করেছে। সে তুলনায় বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও উন্নত দেশ রেখে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরই দোষারোপ করবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, তারা যেন বলতে না পারে–রাষ্ট্রের যা কিছু ছিল, আগের প্রজন্ম সব ভোগ করে গেছে; আমাদের জন্য শুধু উচ্ছিষ্ট রেখে গেছে। এমন একটি রাষ্ট্র রেখে গেছে, যেখানে হানাহানি, রাহাজানি ও নিরাপত্তাহীনতা আছে; বিশুদ্ধ খাবার ও পানি নেই। দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে প্রত্যেককে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে।













