শ্রমিকদের আবাসন, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম থেকেই উদ্যোগ

সার্কিট হাউসে মতবিনিময় সভায় শ্রমমন্ত্রী

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

শ্রমিকদের কল্যাণ, আবাসন, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও শোভন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম থেকেই প্রথম কার্যকর উদ্যোগ শুরু করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ কাজে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিল্পমালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে ‘চট্টগ্রামের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি, কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ’ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভা শেষে প্রেস ব্রিফিং করেন তিনি। এসময় ‘শ্রমিক অসন্তোষ এবং কোনো দুর্ঘটনা হলে শ্রমিকদের কিছু টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আজকে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথেও এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মালিকরাও তাদের বক্তব্য রেখেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বক্তব্য আসছে। এ সমস্যাগুলো একদিনের নয়, দীর্ঘ সময়ের পুঞ্জীভূত সমস্যা। শ্রমিক–মালিকের আজকে পর্যন্ত যে সমস্যাগুলো আছে, সেখান থেকে কিভাবে বের হয়ে আসতে পারি সেজন্য ওয়ার্কিং প্ল্যান করব।

তিনি বলেন, আমরা একটা টার্ম দিয়েছি, আগামী তিন মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা কতটুকু সমাধানের পথে যেতে পারি, সেই নিয়ে আমরা আজকেই ওয়ার্কিং প্ল্যান করব। এছাড়া যেকোনো সমস্যা দ্রুত অন–দ্য–স্পট সমাধানের জন্য বিচার বিভাগ (জাজেস ডিপার্টমেন্ট), জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বিশেষ নিরপেক্ষ টিম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন–দ্য–স্পট দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত হলে পক্ষগুলোর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে। এসময় বন্ধ কারখানা চালুর কোন উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় যারা দেশ থেকে সমস্ত টাকা পয়সা নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে এদের কিছু কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বাইরে পাচার করে দিয়েছে তারা। এখন ব্যাংকের টাকার জন্য বিভিন্ন মিল কারখানা লে অফ করতেছে। আমরা চেষ্টা করছি শ্রমিকদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য। তিনি বলেন, একইভাবে আমরা চেষ্টা করছি আইনের ভেতর দিয়ে বন্ধ কারখানাগুলোকে কিভাবে সচল করা যায়। আপনি চাইলেই একটা প্রাইভেট প্রোপার্টির উপর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা কাজগুলো করছি, যাতে কারখানাগুলোকে বন্ধ না করে কিভাবে সচল করা যায়, আমরা সেই চেষ্টা করছি।

এর আগে সভায় মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের জন্য আবাসন, তাদের সন্তানদের লেখাপড়া এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা কঠিন হলেও এক বা দুটি উদ্যোগ দিয়ে কাজ শুরু করা সম্ভব। একটি সফল উদ্যোগ বাস্তবায়ন অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও এলাকাগুলোকে একই ধরনের কার্যক্রম গ্রহণে উৎসাহিত করবে। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিল্পাঞ্চলের ভেতরে শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দিয়ে এবিষয়ে আইন ও নীতিমালায় শ্রমিকদের কল্যাণে বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তিনি এ বিষয়ে শিল্পমালিক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রতি নিজ নিজ শিল্প এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বনলেন, আমি আইজি সাহেবকে বলব, এখানে যারা সংশ্লিষ্ট আছেন তারা যেন অবিলম্বে শিল্প মালিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। প্রয়োজনে সংসদ সদস্যরাও এ আলোচনায় অংশ নেবেন। দু–একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে শুরু করা গেলে ধীরে ধীরে অন্যরাও এগিয়ে আসবেন।

শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শ্রমমন্ত্রী বলেন, বড় ধরনের স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্টিলের স্ট্রাকচারভিত্তিক অবকাঠামোর মাধ্যমে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। এতে কয়েক মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সেবা চালু করা সম্ভব হবে।

শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের উপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা যদি চট্টগ্রাম থেকে শুরু করতে পারি, তাহলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকায় এধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। আমাদের উদ্দেশ্য যদি পরিষ্কার থাকে এবং সবাই একসাথে মিলেমিশে কাজ করি, তাহলে কাজ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে না।

তিনি এসময় সংশ্লিষ্ট শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন ও অংশীজনদের নিজ নিজ এলাকার সমস্যা ও প্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কল্যাণে যেসব বিষয় অন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, সেগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

বৈদেশিক শ্রমবাজার সমপ্রসারণ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, সাধারণ কায়িক শ্রমের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘হোয়াইট কলার’ বা দক্ষ পেশাদার কর্মী পাঠাতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত, নিম্ন–মধ্যবিত্ত বা হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে কোনো ধরণের চুক্তি ছাড়াই ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এ টাকা শিক্ষার্থীর হাতে না দিয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের সেমিস্টার ফি অনুযায়ী ক্যাশ পাঠানো হবে। একই সাথে দুবাই, কোরিয়া ও কাতারের মতো দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী ড্রাইভিং ও টেকনিক্যাল বিষয়ে ওয়েল–ট্রেইন্ড কর্মী বানিয়ে বিদেশে পাঠানো হবে।

সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেন বলেন, শ্রমিক শ্রেণীর ভাগ্য উন্নয়নে দুটি বিষয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি হচ্ছে শ্রমিকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। যে শ্রমিকরা তাদের শ্রম ও ঘামে দেশের অর্থনীতি নির্মাণ করেন, তাদের জন্য যদি সুচিকিৎসার পর্যাপ্ত বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়, তাহলে তারা আরও বেশি কর্মস্পৃহা পাবেন, নিরাপদ বোধ করবেন এবং তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া, শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারলে, তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে যেতে পারবেন। এতে তাঁদের কর্মদক্ষতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে চট্টগ্রাম ৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম ১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তালুকদার, চট্টগ্রাম জেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম সভায় বক্তব্য রাখেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়তেই বাংলা কিউআর : খসরু
পরবর্তী নিবন্ধরেলসেবার মান বাড়াতে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা