বিশ্বব্যাপী স্তন ক্যান্সার একটি নীরব ঘাতক। চট্টগ্রামেও বাড়ছে স্তন ক্যান্সারের রোগী। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত এক বছরে ক্যান্সার আক্রান্ত নারী রোগী এসেছেন ২ হাজার ৭০০ জন। এরমধ্যে ৩০ শতাংশেরই ছিল স্তন ক্যান্সার। চিকিৎসকরা বলছেন, যেকোন বয়সেই স্তন ক্যান্সার হতে পারে। তবে মরণব্যাধি এই ক্যান্সার এড়াতে সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের পরিবতন করতে হবে। বিশেষ করে ফাস্ট ফুড, লাল মাংস, শুঁটকি, সিগারেট, পান এবং তামাক জাতীয় যেকোন ধরণের পণ্য সেবন থেকে বিরত থাকলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে স্থূলকায় নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যয়াম ও কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। এদিকে আজ থেকে পুরো অক্টোবর মাসজুড়ে স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস বলা হচ্ছে। এ মাসে বিভিন্ন মেডিকেল, হাসপাতাল ও সরকারি–বেসরকারি সংস্থা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতার অংশ হিসেবে র্যালি–সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে থাকে।
চমেক হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরের মধ্যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জন বিভিন্ন ক্যান্সার রোগী রেডিওথেরাপি নিচ্ছে। এরমধ্যে ২৫ শতাংশই হচ্ছে স্তন ক্যান্সারের রোগী। তবে রেডিওথেরাপির মেশিনেরও রয়েছে সংকট। বর্তমানে একটি মাত্র কোবাল্ট–৬০ মেশিন দিয়ে রেডিওথেরাপি কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। তবে চমেক হাসপাতাল সংলগ্ন ক্যান্সার ভবন চালু হলে সেখানে রেডিওথেরাপির জন্য পর্যাপ্ত মেশিন স্থাপিত হবে বলে চিকিৎসকরা।
অপরদিকে চিকিৎসকরা জানান, মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গ–প্রত্যঙ্গের মতো স্তনে থাকে কোটি কোটি কোষ। প্রতিনিয়তই অসংখ্য কোষ ধ্বংস হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে নতুন কোষ তৈরি হয়ে শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলে। কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন নতুন কোষ প্রস্তুত ও বয়োবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি শরীরে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু কোনো বিশেষ অবস্থা বা বস্তুর কারণে কোনো কোষের জিনের গঠন পরিবর্তন হয়ে গেলে সেই কোষ শরীরের কেন্দ্রীয় হুকুম ও বিধিনিষেধ অমান্য করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে। এই কোষ তখন আর অন্য কোনো নিয়ন্ত্রণ মানে না। মাস থেকে বছরের মধ্যে এই কোষ দ্রুত বৃদ্ধির ফলে নির্ণয়যোগ্য একটি কোষপিণ্ডে পরিণত হয়। এই ধরণের কোষপিণ্ডকে টিউমার বলা হয় থাকে। টিউমারের আকার বৃদ্ধির জন্য সাধারণত অঙিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। এই সরবরাহ পর্যাপ্ত না হলে টিউমার একটি মটরদানার চেয়েও বড় হয় না। তবে টিউমারে রক্ত সরবরাহ থাকার কারণে তা থেকে ক্যান্সারকোষ বিচ্ছিন্ন হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিকর ক্যান্সার কোষ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ইনভেশন বা মেটাস্ট্যাসিস। স্তন ক্যান্সারের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে–মাথা ব্যথা, স্তনব্যথা, স্তনের কোনো অংশ ফুলে যাওয়া, চামড়ার ফুসকুড়ি, স্তনের কোনো অংশের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া অথবা চামড়া মোটা হয়ে যাওয়া এবং স্তনে কোষপিণ্ডের উৎপত্তি হওয়া। তবে সব কোষপিণ্ড ক্যান্সারের কারণে সৃষ্টি নাও হতে পারে। তবে ক্ষতিকর হোক বা না হোক, স্তনে কোন ধরণের কোষপিণ্ড ধরা পড়লে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ক্যান্সার হয়েছে কিনা তা নির্ণয় করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বয়ঃসন্ধি থেকে যারা বেশি বেশি ফলমূল ও আঁশজাতীয় সবজি খেতে অভ্যস্ত তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্যদের ২৫ শতাংশ কম বলে চিকিৎসকরা। এর বাইরে প্রতি সপ্তাহে আপেল, কলা এবং আঙুর খেলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। তবে প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক ব্যয়াম করলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া বংশের কারো স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে এক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুন। চিকিৎসকরা জানায়, মেনোপোজের পর নারী দেহের বেশিরভাগ ইস্ট্রোজেন আসে ফ্যাট টিস্যু থেকে। আর ফ্যাট টিস্যু যতবেশি হবে ততই ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়বে এবং স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
অপরদিকে স্তনের অস্বাভাবিকতা শনাক্তের জন্য নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করার প্রতি জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, স্তনের কোনো অংশে কোষপিণ্ড বা টিউমার আছে কিনা তা সেটি বুঝার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের আঙুল দিয়ে পুরো স্তন নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া স্তন পরীক্ষার দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ম্যামোগ্রাফি। ক্যান্সারের স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে বংশের কারো স্তন ক্যান্সারের পূর্ব ইতিহাস থাকলে অবশ্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে নারীদের সচেতন হতে হবে। বংশের কারো এই রোগ ধরা পড়লে তাকে আরো অধিক সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া পরিমিত খাদ্যাভাস, কায়িক পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাবোধ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
চমেক হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলী আসগর দৈনিক আজাদীকে বলেন, নারীদের মধ্যে যত ধরণের ক্যান্সারের রোগী আছে, এখন স্তন ক্যান্সার সবার শীর্ষে রয়েছে। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। স্তনে কোনো ধরণের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসায় স্তন ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য।
এদিকে স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস উপলক্ষে চট্টগ্রামে গত বছরের ন্যায় এবারও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিএসসিআর এবং স্নাতকোত্তর সার্জিকাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পিজিএস একাডেমিয়ার সমন্বিত উদ্যোগে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এই আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত েহোসেনের নেতৃত্ব চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয় প্রাঙ্গন থেকে এক শোভাযাত্রায় চিকিৎসক, সংবাদকর্মী, শিক্ষক, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা–কর্মচারী, সিএসসিআর এবং পিজিএস একাডেমিয়ার সদস্যবৃন্দ, নার্সসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া পুরো অক্টোবর মাসব্যাপী প্রতি রবিবার, মঙ্গলবার ও বুধবার বিকাল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত সিএসসিআর এ বিনামূল্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং ও কনসালটেশন কার্যক্রম চলবে।









