বিগত বছরগুলোতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণে ইলিশ ভারতে রপ্তানি করতো। তবে ব্যবসায়িক ও নানা বাস্তব কারণে অনুমোদিত পুরো ইলিশ রপ্তানি করা যেতো না। প্রতিবছর সরকার ১,২০০ থেকে ৩,০০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিলেও প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ সাধারণত এক হাজার টনেরও কম ছিল। যেমন ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৩,৫৫০ টন অনুমোদনের বিপরীতে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৬৬৫ টন এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে অনুমোদিত কোটার বিপরীতে মাত্র ৫৭৪ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছিল। এই বছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি এখনো মেলেনি। তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রচুর আগ্রহ থাকে বাংলাদেশের, বিশেষ করে পদ্মার ইলিশের প্রতি। কারণ স্বাদ ও গন্ধে পদ্মার ইলিশ বিশ্বের সেরা। যদিও বর্তমানে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমছে। আর সেই সুযোগে ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে ইলিশ। গত দুই/তিন মাসে ভারতের গুজরাটের ভারুচ অঞ্চল থেকে বেনাপোল স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ আমদানি হয়েছে। আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। দেশে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়া এবং স্থানীয় বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে এই মাছ আমদানি করছেন। পদ্মা–মেঘনা ও স্থানীয় ইলিশের মতো এর স্বাদ ও সুবাস না থাকলেও সাধারণত দেখতে একই রকম হওয়ায়, ক্রেতারা দেশীয় ইলিশ ভেবে এটি কিনছেন। ভারতের এই উল্টো ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় মৎস্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা তলব ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিগত এক দশক ধরে দেশে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ বাড়ার পর হঠাৎ ধস নেমেছে। গত দুই বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। সেই সঙ্গে দেশে ধরা পড়া ইলিশের আকার আগের চেয়ে আরও ছোট হয়েছে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের অভিমত, ইলিশের আকার ছোট হওয়ার পেছনে কোনো বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব তাঁরা দেখছেন না। তাঁদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন ইলিশ আহরণ এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়াই সমস্যার মূল কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা–মেঘনা অববাহিকায় ইলিশ ডিম ছাড়ার পর মার্চ–এপ্রিলে জাটকা ইলিশ ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যেতে থাকে। এ সময় নদ–নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে এবং উপকূলীয় সাগরে আর্টিসানাল ট্রলারের (যেগুলো ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে) মাধ্যমে ব্যাপক হারে জাটকা নিধন করা হয়। এতে ইলিশ সাগরে যেতে পারে না ও পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। পাশাপাশি নদী দখল ও দূষণের ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট এবং নাব্যতা সংকটের কারণেও ইলিশ ঠিকমতো বড় হচ্ছে না। এ পরিস্থিতি নিয়ে জেলে, ব্যবসায়ী ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না নিলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, যা পরের বছর কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। আর ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা আরও ২৯ হাজার টন কমে নেমে আসে ৫ লাখ টনে। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশের আহরণ কমেছে ৭১ হাজার টন। যা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা।
মৎস্য অধিদপ্তর ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাত বছর আগে বাংলাদেশের ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০–৫৫০ গ্রাম, যা এখন ৩০০–৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪.৬৫ ইঞ্চি। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১৩.৩৯ ইঞ্চিতে।
ইলিশ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দ্রুত বড় হয়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে সেটির আকৃতি ১১.৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। ৫–৭ বছর বেঁচে থাকলে ২২.৬৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। তবে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে বলে মনে করেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, নদীতে পলি জমা, নাব্যতা–সংকট ও চর–ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বৃষ্টির অনিয়ম, নদীর পানি দূষিত হওয়া সব মিলিয়ে প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ আগের মতো নেই।
জানা যায়, জাটকা নিধন ঘটে মূলত তিন ধাপে। প্রথম ধাপে একেবারে ছোট বাচ্চা, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বাজারে বিক্রি হয়, সেগুলো ধরা পড়ে। এ পর্যায় থেকে যেসব বাচ্চা রক্ষা পায়, সেগুলো পরে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচারে ধরা হয়। এরপরও যেসব জাটকা বেঁচে সাগরের দিকে যেতে থাকে, সেগুলোকে বড় ট্রলিং ট্রলার এবং কাঠের রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ধরা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না।
এদিকে মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে ২৮,০০০ আর্টিসানাল ট্রলার (যেগুলো ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে) ও ২৬৮টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার (৪০ মিটারের বেশি গভীরতায় যে ট্রলার মাছ ধরে) সমুদ্রে মাছ ধরে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো যখন গভীর সমুদ্রে মাছ পায় না, তখন সেগুলো ৪০ মিটার গভীরে থাকা জাটকা ইলিশ ধরে। এর ফলে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা যায়নি। জানা যায়, দুই বছর ধরে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম উপকূলে সমুদ্রগামী কাঠের কয়েক হাজার ট্রলারকে স্থানীয় প্রযুক্তিতে ‘ট্রলিং ট্রলারে’ রূপান্তর করা হয়েছে। এসব ট্রলারে ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ বেহুন্দি জাল ব্যবহার করে অগভীর সমুদ্রে নির্বিচারে মাছ ধরা হচ্ছে, যা ইতিমধ্যে মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে মৎস্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুকূল প্রতিবেশ ব্যবস্থা না থাকলে ইলিশের আহরণ আরও কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের করা সামপ্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন) রয়েছে। এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮% কমেছে। যার বড় কারণ নদীদূষণ। তাঁদের মতে, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে, যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত, বঙ্গোপসাগর থেকে মেঘনার মোহনা দিয়ে ইলিশের প্রবেশমুখগুলোতে ডুবোচরের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ইলিশ আসার পথ আটকে যাওয়ায় নদীতে আগের চেয়ে কম ইলিশ ধরা পড়ছে। বিশেষ করে বড় ইলিশগুলো উপকূলের কাছাকাছি ও নদীতে আসা কমিয়ে দিয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ কর্মকর্তাদের অভিমত, নদ–নদীতে নাব্যতা–সংকটের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অনেক মাছ সাগরে যেতে না পেরে পূর্ণ আকারে বেড়ে উঠতে পারছে না। গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁরা বলেন, ৬.৫ ইঞ্চি আকারের ইলিশের ওজন ৫০–১০০ গ্রাম। অথচ এই ছোট মাছের মধ্যে ডিম তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে সাগরে যেতে পারলে এগুলো আরও বড় হতে পারত। তাঁরা জানান, ২০২০ সাল পর্যন্ত গভীর সমুদ্র থেকে বড় ইলিশ বেশি আহরণ করা হয়েছে। তবে ইলিশসহ দেশের প্রাকৃতিক উৎসের মাছের প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও সুরক্ষায় করণীয় কী–এসব বিষয়ে মৎস্যবিজ্ঞানীরা বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেন, বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর অন্যতম উর্বর সামুদ্রিক অঞ্চল। যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার পুষ্টিসমৃদ্ধ জলের ধারা মিশেছে। এমন পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলেন, ‘দক্ষিণের বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদ–নদী ঘিরে আমরা একটি নতুন অভয়াশ্রমের প্রস্তাব মৎস্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিলাম। সেটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই তিন নদীর মোহনায় চর অপসারণ ও দেশের কোন নদীতে কী পরিমাণ দূষণ হচ্ছে, তার মাত্রা পরীক্ষা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’ শুধু আইন বা ভয় দেখিয়ে জাটকা ধরা বন্ধ করা অসম্ভব উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, এ জন্য প্রয়োজন জেলেদের এই কাজে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত ও কাউন্সেলিং করা। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে যাতে জেলেরা আর্থিকভাবে দুর্দশায় না পড়েন, সে জন্য তাঁদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিতের পাশাপাশি ঋণের কিস্তি যাতে দিতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তদারকি বাড়িয়ে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ আহরণ বন্ধ করা। আর এসব ব্যবস্থা সমন্বিত ও কঠোরভাবে প্রতিপালন করা গেলেই ইলিশের সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
লেখক: কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।












