বৃহস্পতিবার আজ। মানে এখানকার সাপ্তাহিক ছুটির প্রথম দিন। মরুতে আসার কিছুদিন পর থেকেই অন্তত বৃহস্পতি আর শুক্রবার নাস্তা করি আমি ভরপেট পান্তা খেয়ে; খাওয়া হতো যা দেশে, কালে ভদ্রে, অনেক অনুনয় বিনয় করে। ব্যতিক্রম ছিল পহেলা বৈশাখ। ঐদিন সবাই মিলে খেতাম পান্তা ঘটা করে ।
মরুতে এসে ক্ষণেক্ষণেই বাঙ্গাল মন, দেশের জন্য কাঙ্গাল হয়ে উঠায়, সেই ক্ষতিপূরণের লক্ষে সপ্তাহের দু দিন কে বানিয়ে নিয়েছি পহেলা বৈশাখ। রান্না যেহেতু নিজেই করি, আমায় আর কে ঠেকায় এখানে ছুটির দিনের সকালের পান্তা থেকে !
গতকাল যদিও ফাহাদ বলেছিল আসবে তুলতে সকাল আটটায়, তারপরও এ ক’মাসের অভিজ্ঞতায় ধরে নিয়েছিলাম সেই আট টা বাজতে বাজতে ঘড়ি যাবে দশটার ঘরে। লম্বা ঘুম দিয়ে ন’টায় উঠে সাড়ে ন’টার দিকে পোড়া মরিচের ঝালের আলুভর্তা আর ডাবল অমলেট দিয়ে ভরপেট পান্তা খেয়েছিলাম।
নাহ, সময় বিষয়ে আমার অনুমান ভুল প্রমাণ করে, এসেছিল ফাহাদ এগারটায়। বাসার অপেক্ষার ঐ সময়জুড়ে ক্ষণে ক্ষণে বাদাম, খেজুর চিবিয়েছি যেমন, তেমনি গাড়িতেও সারাক্ষণই ফাহাদের তাগাদায় চিবুতে হয়েছে চিপস, বিস্কিট, বাদাম। লাঞ্চের তাড়া নেই তাই মোটেও। তারপরও ভাবলাম দোকান পাওয়া গেছে যখন, কিছু খাবার ড্রিঙ্কস কিনে নেই না কেন?
ডজন খানেক জুস, ড্রিংক্স, আর একগাদা বাদাম বিস্কিট চিপস দু হাতে নিয়ে, গাড়ির কাছে ফিরতেই;
“কী দরকার ছিল? কি দরকার ছিল?”
বলতে বলতে এক্কেবারে হা হা করে ফাহাদ ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে, গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ওগুলো ঢোকাতে শুরু করতেই চক্ষু আমার চড়কগাছ! মিনিবাস সাইজের অত্যাধুনিক এই এসইউভিটি, যেটি ফাহাদের সাপ্তাহিক মরুযাত্রার বাহন, সেটির পেছনের অংশটি নানান খাদ্যসামগ্রী, জামাকাপড় তৈজসপত্রে ঠাঁসা। অনায়াসে সেটিকে দেয়া যায় বলা চলে চলন্ত মিনি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। দেখেই পেলাম টের, ফাহাদের রক্তে মরু বেদুইনটিকে।
হুম, এনেছি ; তাই বলছো, কী দরকার ছিল? না আনলে নির্ঘাত মিসকিন ভাবতা। রাখো এখন এগুলো। এই যে দিলাম –লিখে রাখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির– “হোয়াট? হোয়াট মিঃ সেলিম”। আই মিন, ইটস এ মেয়ার ড্রপ অব ডিউ, ইন ইউর ওসেন। কী বুঝল ফাহাদ? কে জানে? হা হা করে হাসতে হাসতে আঙুল তূলে দূরের বাদামি দিগন্তের দিকে দেখিয়ে বলল ‘তাইলে চল যাই এখন, ঐ যে দূরের গ্রামে।’
না না, তার আগে চল যাই আমার ঐ ভাইদের কাছে। এতো কাছে এসে মোলাকাত না করেই চলে যাবো, তা হয় না। বলেই শীতের দুপুরেও মুড়িভাজা বালুতে হেঁটে বেড়ানো একটু আগে তারই দেখানো দূরের মনুষ্যাকৃতিগুলো দেখালাম।
অপ্রস্তুত হলো মনে হয় কিঞ্চিৎ। তবে সাথে সাথে “ওকে”, “ওকে” বলতে বলতে পেট্রোল পাম্প থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে সোজা বালির উপর দিয়ে চালিয়ে দিল ফোর হুইল ড্রাইভের প্রচণ্ড শক্তির যানটিকে, ফাহাদ।
হোক যতই শক্তিমান, থাকুক যতোই এই আজদাহার চার চাকার জোর, পায়ের নীচে শক্ত কংক্রিট বা নিদেনপক্ষে মাটি না পেলে, যে কোনই বীরের অবস্থাই যে হয় টলটলায়মান, খড় খড়ে আলগা বালির উপর দিয়ে গাড়ী এগুতেই, পেতে থাকলাম টের হাড়ে হাড়ে! কপাল ভাল, মিনিট পাঁচ সাতেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। মঞ্জিলে পৌঁছেই গাড়ীর সুশীতল আরাম ছেড়ে, দিলাম ঝাঁপ জ্বলন্ত কড়াইয়ে। কোম্পানির ইউনিফর্ম পরা চারজন লোক, পরিষ্কার করছে মরুভূমির এই অংশে পড়ে থাকা নানান পলিথিন ও প্লাস্টিক আবর্জনা। পিকনিক স্পটই হবে জায়গাটা। মনে হচ্ছে আমদের দেশের মতোই, শহুরে সৌদিরাও এখানে বেড়াতে এসে নানান খাবার ও পানিয়ের পলিথিন প্লাস্টিকের যাবতীয় প্যাকেজিং জঞ্জাল ফেলে যায়, অবলীলায়।
যা গরম! বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। তদুপরি ফাহাদ ছাড়েনি ড্রাইভিং সিট। অর্থাৎ চাচ্ছে না সে, খুব একটা দেরি করি। এরই মধ্যে পিঠে বস্তা নিয়ে আবর্জনা কুড়াতে কুড়াতে নিজেদের মধ্যে করা তাদের বাৎচিত কানে যেতেই বুঝেছি, দেশী ভাইই ওনারা। কাজে এতোটাই নিমগ্ন তারা যে, এরকম একটা আজদাহার উপস্থিতি মোটেও করেনি খেয়াল।
হতে পারে এতেই অভ্যস্ত এরা। প্রায়শই হয়তো বিলাসবহুল গাড়ী নিয়ে, সময়ে অসময়ে হাজির হয় বেদুঈন রক্তের ম্রুবিলাসি কোন না কোন সৌদি। ঐদিকে হয়তো চোখ তূলে তাকানোরও নিয়ম নেই। ফলে এই মুহূর্তে এখানে যে এক খ্যাংরাকাঠি বাঙ্গালও নাজিল হয়েছে, টেরই পায়নি। দ্রুত এগিয়ে তাই সবচেয়ে কাছের জনকে জিজ্ঞেস করলাম
কী ভাই? কী অবস্থা? আছেন কতদিন এইখানে?
চমকে ফিরে তাকালেন জনাব। এরপর অধমের বোধের অগম্য আরবিতে, কিছু একটা বললেন বাকীদের উদ্দেশ্যে। দ্রুত সামনে এগিয়ে বালিতে পড়ে থাকা ক্যানটি তুলে ঢোকান ঝুলিতে। এরপর এ বাঙ্গালের উপস্থিতি উপেক্ষা করে গোটা দলটি ব্যস্ত সমস্ত হয়ে আবর্জনা কুড়িয়ে বস্তায় চালান দিতে দিতে, সরে যেতে থাকলো দূরে!
হূম, কোন পিরিতের আলাপ করার সময় বা রুচি নাই ওনাদের। কিছুটা আহত হয়ে গাড়িতে ফিরতেই হাসতে হাসতে বলে ফাহাদ– “কি ব্যাপার তোমার বন্ধুরা পাত্তাই দিল না নাকি?” পিত্তি তাতে জ্বলে গেলেও সামলালাম নিজেকে। বললাম– ওরা সম্ভবত মালিকের দেয়া টার্গেট পূরণে ব্যস্ত। কথা বলে সময় নষ্ট করার সময় নাই। আবার হতে পারে, তারা হয়তো তোমাকে আমাকে মনে করেছে মালিকপক্ষীয় কেউ। চল, চল, এখন ঐ গ্রামেই যাই– মূল সড়কের দিকে গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে, বাজাতে শুরু করলো ফাহাদ এবার ফের, তার পুরানো ঐ ভাঙ্গা রেকর্ড– “মিস্টার সেলিম, তুমি যেভাবে অফিসে কাজের গতি বাড়িয়েছ, তার সাথে আমার বস, মোটকা হাতি সিরিয়ান বুইড়া তাইসির, মোটেও তাল মিলাতে পারছে না। কেন যে কোম্পানি একে পুষছে? তুমি নিশ্চয় বুঝেছ, রেগুলেটরি ডিপার্টমেন্টে আমি ছাড়া ঐ ব্যাটা একদম ল্যাংড়া,কানা। ওকে বাদ দিয়ে আমাকেই দেয় না কেন ফিল ডিপার্টমেন্টটা। মিঃ ফিল তোমাকে তো খুব পছন্দ করে। আজকাল চলছেও সবই তোমারই ইশারায়!” মরুর বালিতে বেশ কসরতে গাড়ি ঘুরিয়ে ফের রাস্তায় উঠতে উঠতে, উপক্রমণিকা হিসাবে নিজ বসের ব্যাপারে বলা কথাগুলো কানে যেতেই, বুঝলাম অচিরেই সে অবতারণা করবে কোম্পানিতে, তার ভাষায় যে মিশ্রি মাফিয়ারা মানে মিশরিয়রা আছে, তাদের শায়েস্তা করার কথাও।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।












