দেশ তথা পৃথিবী জুড়ে খুব অস্থিরতা চলছে। আমাদের দেশে জনসংখ্যার আধিক্যতা অস্থিরতার একটা কারণ হতে পারে। কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে যে সংবাদগুলো দেখি সেগুলো প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে বিচলিত করে। আগে এ রকম ছিল না। শিশু নির্যাতন, অপহরণ, প্রকাশ্য দিবালোকে কোপায়ে মানুষ হত্যা করা। হত্যা করে টুকরো টুকরো করে ফেলা, ছিনতাই, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, গলায় ছুরি বসানো। এগুলো নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা–বাবার অসাবধানতায় প্রতিদিন শিশুরা পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে। এমনি অসংখ্য অপরাধ সমাজে সংঘটিত হচ্ছে। যত্রতত্র আইন নিজের হাতে তোলে নিচ্ছে। অপরাধীকে পিটাতে পিটাতে মেরে ফেলা। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। এ কোন্ সমাজে আমরা বাস করছি! ভাবলে মনে হয় কেউ আমরা নিরাপদ নই। যে কোনও সময় যে কারো ওপর বিপদ আসতে পারে। সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। কবে আসবে সে দিন যে দিন নির্ভয়ে চলতে পারবে। ঘরে বাস করতে পারবে। গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল, কত পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। কোনো সরকার এটা থামাতে পারছে না। আমরা সমাজবদ্ধ জীব যেখানে একে অপরের দুঃখ ব্যথায় সমব্যথী হওয়ার কথা। সেখানে আত্মীয়তার আত্মীয়ের, বন্ধু তার বন্ধুর, প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীর সর্বনাশ করতে সদা সচেষ্ট। সামান্য স্বার্থ আর লোভের কারণে নিষ্পাপ, নিরপরাধ শিশুর জীবন হরণে হৃদয় কাঁপে না। মানুষের মধ্যে স্নেহ মায়া মমতা, সততা, সম্প্রীতি দিন দিন লোপ পাচ্ছে। একজন একজনকে মোটেই সহ্য করতে পারছে না। একটু কথা কাটাকাটিতে হত্যা করা হচ্ছে। ন্যায়নীতি থেকে বিচ্যুত জীবনযাপন করছে মানুষ। সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাচ্ছে। সবাই অনৈতিক বাণিজ্যে লিপ্ত। কোথাও সুস্থ সমাজ ও মানবিকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়গত বা গোষ্ঠীগত কারণে সমাজে বিভেদ, বিভাজন বিরাজমান। এমনিতে দেশ রাজনৈতিকভাবে বহুদিন থেকে বিভাজিত। তাতে দেশের উন্নয়ন ও সুশাসন বাধাগ্রস্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সততা, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়নীতি, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, শিষ্টাচার, ক্ষমা, উদারতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, সুকুমার বৃত্তি–মানবিক গুণাবলী সমষ্টি। আজ গোটা সমাজ এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সমাজ থেকে লোপ পাচ্ছে। আমরা জানি আদর্শ সংবলিত সমাজে কোন অনাচার থাকবে না। ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, শোষণ, স্বার্থপরতা, কুপ্রবৃত্তি, বেকার সমস্যা, আর্থিক দীনতা, কুসংস্কার যতদিন সমাজ থেকে দূর হবে না ততদিন মানবিক মূল্যবোধ, মানবিকতা জেগে উঠবে না। প্রতারণা, বঞ্চনা, হিংসা, হানাহানি কখন হয় যখন মানুষের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। আর কিছু দুর্বৃত্ত আছে তাদের স্বভাবেই ঐ রকম। বর্তমানে বিশেষ করে তরুণ–তরুণী, কিশোর–কিশোরী তাদের মধ্যে বেশি নৈতিক বিচ্যুতি ঘটেছে– তার প্রধান কারণ আকাশ সংস্কৃতি ও মোবাইল প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিক। তার ওপর অধুনা যুক্ত হয়েছে ‘এআই’। এটা পরিবারকে, সমাজকে, দাম্পত্য জীবনকে প্রেমিক–প্রেমিকাদের, বন্ধু–বান্ধবদের অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে। যাতে আত্মহননের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠছে। এককথায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করছে। সাধারণ নাগরিকেরা পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে পড়ে একটু শান্তিতে বাঁচতে চায়। সম্প্রতি প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি এলাকার ১১ বছরের এক শিশু গৃহপরিচারিকার প্রতি অমানবিক আচরণের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লেখাটা শেষ করব। মা মরা মেয়েটাকে শুধু বেঁচে থাকার জন্য বাবা অন্যের হাতে তোলে দিয়েছিল যেন দুটো খেতে পায়। যখন নিয়ে যাচ্ছে তার বয়স ছিল ৯ বছর। যে লোকটার হাতে তোলে দিয়েছিল সে মেয়েটাকে ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজে লাগায়। দেড় বছর সেখানে ছিল। বাবা মেয়েটার দুরবস্থার খবর পেয়ে খাগড়াছড়ি নিয়ে আসে অর্ধমৃত অবস্থায়। মেয়েটার শরীর ক্ষতবিক্ষত। খাগড়াছড়ির সদর হাসপাতালের বারান্দায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। যার উচ্ছ্বাসে মেতে থাকার কথা সে এখন বিভীষিকাময় জীবন কাটাচ্ছে। মেয়েটির নাম তানিয়া। শরীর জুড়ে আঘাতের চিহ্ন, মাথায় সেলায়। পিঠে খুন্তি পোড়ার গভীর ক্ষত। অপুষ্টি ও নির্যাতনের জন্য হাঁটার শক্তি হারিয়েছে। তাকে দেখে অনেকেই আঁতকে উঠছেন। জানা যায়, দিনমজুর বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েকে লেখাপড়া করাবে। তানিয়া স্থানীয় মাদ্রাসার ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ত। বাবা বেলাল হোসেন মা মরা মেয়েটাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখার জন্য দুই বেলা খাবারের জন্য কাজে পাঠিয়েছিল। এখন বেলাল হোসেনের একমাত্র আশা আমার মেয়েটা যেন বেঁচে থাকে। ডাক্তার বলছেন তার উন্নত চিকিৎসা দরকার। যেহেতু তার বয়স ১১ বছর সে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালায় আইনি সুরক্ষা পাবে। একমাত্র প্রশ্ন এই নিরপরাধ দরিদ্র শিশুদের নিরাপদ জীবন কে দেবে। দেশ সমাজ যখন অস্থিরতার মধ্যে চলে যায়। কেউ আইনের তোয়াক্কা করে না বলে এই সমস্ত ঘটনা ঘটে। একটা জিনিস লক্ষ্যণীয় এই গৃহপরিচারিকা নির্যাতন কিন্তু শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারে ঘটে। ইতিপূর্বেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটবে। এগুলোর সংশোধন হয়েছে কি? ধরা হয়েছে দোষীদের তাদের বিচার হয়েছে কি? সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছে কি বিচারের রায়? একমাত্র বিচারহীনতার কারণে বিপন্ন দরিদ্ররা এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ যতই মজবুত হোক না কেন, সুশাসন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। তাই সুশাসন ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা একান্তই কাম্য।
লেখক: প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।













