বন্ধুদের সাথে আড্ডা, পাহাড় ট্র্যাকিং আর কাপ্তাইয়ের সৌন্দর্যে ভেসে যাওয়ার আনন্দটা নিমেষেই পরিণত হলো বিষাদে। কাপ্তাইয়ের রূপ দেখে যার হাসিমুখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, তিনি এখন ফিরছেন নিথর হয়ে। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর সীতার ঘাট অংশে নেমে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় তিন ঘণ্টা পর রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে উদ্ধার করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী সাজিদ শাহারিয়ার সানমের (২৪) মরদেহ।
সানম নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার নাছির উদ্দীনের ছেলে। তাকে নিয়ে মা-বাবার চোখে ছিল অনেক বড় স্বপ্ন। আর কিছুদিন পরেই পড়ালেখা শেষ করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করার কথা ছিল তার। কিন্তু এক নিমেষের দুর্ঘটনা মা-বাবার সেই সমস্ত স্বপ্ন ও বুকভরা আশাকে ধূলিসাৎ করে দিল।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী ও ঢাকা থেকে আসা ৯ জনের একটি পর্যটক দল রোববার সকাল ১০টার দিকে কাপ্তাইয়ে পৌঁছায়। স্থানীয় গাইড সাথে নিয়ে তারা কাপ্তাইয়ের সীতার পাহাড়ে ট্র্যাকিংয়ে যান। পাহাড় ভ্রমণ শেষে দুপুর দেড়টার দিকে সীতার ঘাট অংশে কর্ণফুলী নদীর পাথর ঘাটা এলাকায় হাত-মুখ ধোয়ার জন্য তারা নদীতে নামেন। এসময় হঠাৎ স্রোতের টানে গভীর পানিতে তলিয়ে যান সানম।
সানমের সহপাঠী ও বন্ধু সাইফুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা ঢাকা থেকে ৯ জন এসে সকালে সীতার পাহাড়ে উঠি। পাহাড় ভ্রমণ শেষ করে নেমে নদী থেকে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য ঘাটে নেমেছিলাম। ঠিক তখনই মুহূর্তের মধ্যে আমাদের বন্ধু সানম পানিতে তলিয়ে যায়। আমরা নিজেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারলাম না।”
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কাপ্তাই থানা পুলিশ, কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিস এবং নৌবাহিনীর ডুবুরি দল। পরবর্তীতে শুরু হয় যৌথ উদ্ধার অভিযান।
উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে কাপ্তাই ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, “বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে প্রায় ৪০ ফিট দূরে নদীর তলদেশ থেকে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়।” তবে কাপ্তাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কাপ্তাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মাহমুদুল হাসান নিশ্চিত করে জানান, নিখোঁজ শিক্ষার্থীর মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ বর্তমানে হাসপাতালে রাখা আছে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
যেই ছেলেকে নিয়ে মা-বাবা কত শত রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই ছেলে আজ চিরতরে শান্ত। কাপ্তাইয়ের মুক্ত বাতাসে আনন্দের যে স্মৃতি তৈরি করতে এসেছিলেন সানম, তা আজ রূপ নিল চিরদিনের কান্নায়। আনন্দের ভ্রমণ শেষে সানম এখন ফিরছেন কফিনবন্দী হয়ে, মা-বাবার বুকে এক নিঃশব্দ হাহাকার রেখে।













