বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বা পে–স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এই বছরের জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে বলে এতে জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার অর্থ বিভাগের জারি করা চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ নামে প্রজ্ঞাপনটি গতকাল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পহেলা জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। দশম থেকে বিশতম গ্রেডের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের ৫০ শতাংশ এই জুলাই থেকে কার্যকর হবে। আপাতত এই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা এই হারে বেতন পাবেন। গত ৩০ জুন তারা সর্বশেষ যে বেতন পেয়েছিলেন, তার সাথে নতুন এই বর্ধিত বেতন যুক্ত হবে। পহেলা জানুয়ারি ২০২৭ থেকে জুন পর্যন্ত তারা বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ (১ম থেকে নবম গ্রেড) এবং ৭৫ শতাংশ (১০ম থেকে ২০তম গ্রেড) কার্যকর হবে। খবর বিবিসি বাংলা ও বিডিনিউজের।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের পহেলা জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির বাকি শতভাগ কার্যকর হবে। সেই সময় থেকে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিও কার্যকর হবে। নতুন বেতন কাঠামো এই বছরের জুলাই থেকে কার্যকর বলে ধরায় সরকারি চাকরিজীবীরা বাকি অংশ পহেলা জুলাই ২০২৬ থেকে থেকে বকেয়া হিসাবে বুঝে পাবেন।
বেতন কাঠামোর সাথে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বা মোবাইল ভাতাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক যেসব সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, সেগুলো ২০২৮ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে পেতে শুরু করবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। যারা পেনশন গ্রহণ করছেন তারাও পহেলা জুলাই ২০২৬ থেকে তাদের পেনশন স্ল্যাব অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর সুযোগ সুবিধা পাবেন। এবারই প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। যার আওতায় মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে। এই পে–স্কেল অনুযায়ী, সকল গ্রেডের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাবেন। গত ৩১ আগস্ট নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করে সরকার। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি জানানো হয়। সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়িয়ে দুই অর্থবছরে তিন ধাপে এই পে–স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সর্বনিম্ন স্তর ২০তম গ্রেডের মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে।
সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তর প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা (সর্বোচ্চ নির্ধারিত) হয়েছে। এছাড়া সিনিয়র সচিব পদে বর্তমানের ৮২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার পদে বেতন ৮৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হবে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা (নির্ধারিত)।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এই পে–স্কেল বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে–স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যে নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। এই বছরের ২১ জানুয়ারি ওই কমিশন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দেয় তারেক রহমানের সরকার।
বকেয়া বেতন মিলবে কবে : সরকারি চাকুরেদের বেতন দ্বিগুণ ও তারও বেশি বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি করে এটি জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার কথা বলেছে সরকার। সেক্ষেত্রে জুলাই ও আগস্ট মাসের বকেয়া মিলবে কবে, এ বিষয়টি সামনে এসেছে। এছাড়া জুলাই থেকে যে হারে মূল বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে তা কি সেপ্টেম্বরের বেতনের সঙ্গেই দেওয়া হবে নাকি আরও কয়েক মাস বকেয়া পড়বে?
একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলছেন, নতুন করে আর বকেয়া না বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। তবে জুলাই ও আগস্ট মাসের বকেয়া কবে নাগাদ দেওয়া হবে তা নির্ভর করছে সরকারের হাতে কত টাকা আছে তার ওপর, বলেছেন তারা।
অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রবিধি ও বাস্তবায়ন) দিলরুবা শাহীনা বলেন, বকেয়া বেতন কবে নাগাদ হবে তা এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আইবাসের (সরকারি কর্মীদের অনলাইনে বেতন নির্ধারণী প্লাটফর্ম) দায়িত্বরততের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বকেয়া বেতন এক বা একাধিক ধাপে পাওয়ার শঙ্কা আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আগে আইবাসের সঙ্গে কথা হোক। এরপর অ্যাডজাস্টমেন্ট কীভাবে হবে তা বলা যাবে।












