আমরা আশৈশব জেনে এসেছি, ‘পাঠাগার হচ্ছে জ্ঞানের ভাণ্ডার।’ স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা নিঃসন্দেহে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা অর্জন বা জ্ঞানার্জন করে থাকে। আমরা স্বীকার করি আর নাই করি, আমাদের দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার পরিবেশ কম–বেশি বিরাজমান রয়েছে। আর এ কাজে সাধারণত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকগণই প্রধানতম ও দায়িত্বশীলের ভূমিকা পালন করে থাকেন। আমাদের দেশের এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ ক্লাসে পাঠদান করা ছাড়াও ছাত্র–ছাত্রীদেরকে বিরতির সময়ে পাঠাগারে গিয়ে পড়াশোনা করার তাগিদ দিয়ে থাকেন, নতুবা পাঠাগার থেকে প্রয়োজনীয় কিংবা পছন্দের বই সংগ্রহ করে বাড়িতে গিয়ে সেগুলো পাঠ করার পরামর্শ মাঝে–মধ্যে দিয়ে থাকেন। কিছু কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষকের পরামর্শ মেনে নিয়ে তাদের পাঠ্যসূচির সাথে প্রাসঙ্গিক কিংবা অতিরিক্ত বই পাঠেও মনোনিবেশ করে থাকে। প্রাসঙ্গিক কিংবা সহায়ক বইপত্র যারা প্রতিষ্ঠানের পাঠাগার কিংবা বাড়িতে গিয়ে পাঠ করে তাদের অনেকেই পরীক্ষায় ভালো ফল লাভে সমর্থ হয়। আবার এমোন বহু শিক্ষার্থীও রয়েছে যারা পাঠাগারের ধারও ধারে না, এমনকী নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের বাইরে তেমন কোন বই–পত্র পড়তেও চায় না। এদের অনেকেই প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার নির্ভরশীল হয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় ভালো ফললাভে সমর্থও হয় কিন্তু সত্যিকারের জ্ঞানার্জনের কাজ এদেরকে দিয়ে সম্ভবপর হয়ে উঠতে চায় না।
দেশের বিপুল সংখ্যাক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পাঠাগার ছাড়াও সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাগার ছাড়াও সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে দেশে চলমান রয়েছে। বর্তমানে সরকারি অনেক গণ–গ্রন্থাগার ভবনই দৃষ্টি নন্দন। ঝক্ঝকে টাইলসের মেঝে, নতুন নতুন চেয়ার–টেবিল আর আলমারীর তাকে তাকে সাজানো থাকে নানা বিষয়ের ওপর হাজারো বই–পুস্তক। সরকারি এসব গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে সবই প্রস্তুত, সবই আকর্ষণীয় ও পরিপাটি অথচ ভেতরে সুনসান নীরবতা। এই নীরবতার কারণ আর কিছুই নয়, কেবলই পাঠক শূন্যতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠাগারগুলোর কথা বাদ দিলে দেখা যায়, সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত অনেক পাঠাগারেই পাঠক সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। জ্ঞান–বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে পাঠাগারগুলোতে পাঠকের সীমিত সংখ্যা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে দুষ্প্রাপ্যতা একটা নিদারুণ বেদনা ও উদ্বেগের বিষয় ছাড়া আর কী ই বা হতে পারে? অথচ সমাজে জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের কথা শিক্ষিত মহলের কারোরই অজানা নয়। আর পাঠাগার বা গ্রন্থগার চর্চার মূল উদ্দেশ্যেই হলো অধিকসংখ্যক পাঠককে পাঠাগারমুখী করা, নানা বিষয়ে জ্ঞান আহরণ ও চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা।
বর্তমানে আমাদের দেশে যাঁরা সুশীল সমাজের সদস্য তথা বুদ্ধিজীবী, লেখক, চিন্তক, শিক্ষাবিদ তাঁরা মনে করেন– এদেশের পাঠাগারগুলোতে দিনের পর দিন পাঠক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেই এ ব্যাপারে একমত যে, আধুনিক প্রযুক্তির অসামান্য বিপ্লব উৎকর্ষতার কারণেই এমোন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এক–দেড় দশক আগেই দৃশ্যটি ছিলো ভিন্নরূপ। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, টিভি, স্মার্টফোন, ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, ইন্টারনেট ইত্যাদি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বর্তমান সময়ের তরুণ–যুব সম্প্রদায়কে কেবল গ্রন্থাগার বিমুখই করেনি, গ্রন্থবিমুখও করেছে অনেকখানি। কিন্তু এ থেকে তো পরিত্রাণের পথ খুঁজে বের করতেই হবে। এগিয়ে আসতে হবে সরকারসহ সমাজের সব শ্রেণী ও পেশার গ্রন্থপ্রেমিক ও জ্ঞানপিপাসু জনগোষ্ঠীকে। পাঠাগার চর্চা শিক্ষিত মহলের পাঠোভ্যাসের প্রক্রিয়াটি চলমান রাখার যে একটি সুদূর প্রয়াসী গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও সুফল রয়েছে– এ কথাটি সবাইকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে। আর সে কারণে সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত পাঠাগারগুলোতে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নানারুচির পাঠককে আকৃষ্ট করতে এসব গ্রন্থাগার নানামুখী উদ্যেগ গ্রহণ করতে পারে। যেমন : ১.পাঠকবৃন্দের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক পত্রিকা নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা। আমার জানামতে, আমাদের সমাজে এমন অনেক পাঠকই রয়েছেন, যাঁরা বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায় তাঁদের নিকটস্থ পাঠাগারে গিয়ে পত্রিকা পাঠে সময় অতিবাহিত করেন আর মাঝে–মধ্যে তাঁদের পছন্দের বই সাথে করে নিয়ে এসে বাড়িতে বসে পাঠ করেন। তাই, গ্রন্থাগারগুলোতে পত্রিকা সরবরাহের কাজটি অতিশয় জরুরি। ২. পাঠাগারের যাঁরা নিয়ন্ত্রক তাঁদের উচিৎ পাঠাগারকে ঘিরে মাঝে–মধ্যে সাহিত্য, সাংস্কৃতিক উৎসব বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সম্ভব হলে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা। এক্ষেত্রে, স্থানীয় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা মননশীল কাজে নিয়োজিত নির্ভরযোগ্য কোন সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। নানা ধরনের ইতিবাচক ও প্রচারমুখী কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাগার সংলগ্ন এলাকার জনগোষ্ঠীকে এ কথাটি সুস্পষ্টভাবে বুঝাতে হবে যে, বইপত্র–পত্রিকাসহ পাঠের বিভিন্ন উপকরণ অধ্যয়ন করলে পাঠক তাঁর মেধা ও মননের উন্নতি লাভে যথেষ্ট সমর্থ হন। এ কথাটি কে–না বোঝেন যে, একমাত্র মেধাবী, জ্ঞানবান আর মননশীল ব্যক্তিগণই পারেন সমাজকে সত্যিকার অর্থেই আলোকিত করতে? সমাজকে বদলে দিতে? তাই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমাজকে আলোকিত করতে আধুনিক পাঠাগার চর্চা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। পাঠক আসুন, সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে পাঠ ও জ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি করার ভেতর দিয়ে আমরা মননশীল নাগরিক তৈরিতে সবাই আন্তরিক ভূমিকা রাখি।
লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক, মিরসরাই কলেজ













