অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

| শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (৩য় পর্যায়), রাজধানীর তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পসহ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গত বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত চলতি অর্থবছরের একনেকের তৃতীয় সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভাশেষে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে পাওয়া যাবে অবশিষ্ট ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প ৭টি এবং সংশোধিত প্রকল্প ৫টি।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুমোদিত দুটি প্রকল্প হলো : ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘রাজশাহী সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ এবং ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (৩য় পর্যায়)’

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উপযুক্তকরণ এবং টেকসই করা। অর্থাৎ কোনো দেশের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সেদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। পিছিয়ে থাকা অঞ্চল বলতে সাধারণত সেসব অঞ্চলকে বোঝানো হয় যেসব অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। সুবিধামতো সময়ে পণ্য পরিবহন করা যায় না, শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার অনুকূলু পরিবেশ থাকে না এবং এসব কারণে বেকারত্বের হারও থাকে বেশি। এসব কারণে সেই পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে দেশের অগ্রসরমান অঞ্চলের সাথে যুক্তকরণ আবশ্যক হয়।

পণ্য উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করে পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি, পণ্যের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সুষম উন্নয়ন বলতে বোঝায় সব অঞ্চলের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায়নের সময়কালে যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে। যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, মধুমতি সেতু, মহাসড়কের উন্নয়ন, গ্রামেগঞ্জে পাকা রাস্তা হওয়া, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেলসহ যোগাযোগ ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান তাঁর এক লেখায় বলেছেন, গত দুই দশকে বেশ কয়েকটি বড় যোগাযোগ অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু সমন্বিত পরিকল্পনা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার অভাবে চলাচলে গতিশীলতার সুবিধা পাওয়া গেলেও অর্থনৈতিকভাবে তেমন কোনো সুবিধা এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক ধারণার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আংশিক পরিকল্পনা মেগা প্রকল্পগুলোর পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করার কথা ছিল, বর্তমানে চলাচল করছে তার একচতুর্থাংশ। এতে সরকারকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

১৯৯৮ সালে চালু হওয়া চার লেনের যমুনা সেতুর দুই প্রান্তে ২৫ বছর পরে এসে দুই লেনের সড়ককে চার লেনে রূপান্তরিত করাকেও সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) অসম্পূর্ণতা ও স্বল্পদৃষ্টি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। কেননা, সেতুর দুই প্রান্তে চার লেনের সড়ক আগে বাস্তবায়ন করা গেলে যমুনা সেতু উত্তরাঞ্চল, তথা পুরো দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বেশি অবদান রাখতে পারত। আবার নির্মাণপদ্ধতি পরিবর্তিত জলবায়ুসহিষ্ণু না হওয়ায় এবং নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান ঠিক না থাকায় ব্যয়বহুল মহাসড়কও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রকল্প নেওয়া, যথাসময়ে প্রকল্প শেষ না করা এবং সড়ক নির্মাণে বরাদ্দ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণে আলাদা কোনো বরাদ্দ না থাকার অভিযোগও আছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদারের সক্ষমতার ঘাটতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ না থাকায় সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে তুলনামূলকভাবে বেশি খরচ হয় এবং সময়ও বেশি লাগে। যানজট নিরসনে শুধু উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হয়, কিন্তু গ্রেডসেপারেটেড ইন্টারচেঞ্জ তৈরি করা হয় না। এতে উড়ালসড়কগুলোয় ওঠানামার পথেই ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, টেকসই যোগযোগব্যবস্থা ও স্বল্প ব্যয়ে রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে প্রয়োজন প্রচুর গবেষণার। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন সড়ক গবেষণা ল্যাবরেটরি থাকলেও সেখানে রয়েছে নিয়মিত ও যোগ্য গবেষকের অভাব। তাই টেকসই সড়ক অবকাঠামোর জন্য সক্ষম গবেষক নিয়োগ ও নিয়মিত গবেষণার লক্ষ্যে সব প্রকল্প থেকে ১২ শতাংশ অর্থ অন্যান্য উন্নত দেশের মতো এ খাতে বরাদ্দ রাখতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে