যোগেশ চন্দ্র সিংহ : যুগের মনীষীকে শ্রদ্ধায় স্মরণ

শাহরিয়ার আদনান শান্তনু | মঙ্গলবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ

হে প্রভু নিরঞ্জন, আমি যে চারিদিকে অন্ধকার দেখিতেছি, কোথাও যে সান্ত্বনার উপাদান খুঁজিয়া পাইতেছি না। অথচ মানসিক বুদ্ধিতে যেন অনুভব করিতেছি যে তুমিই সর্বত্র ব্যাপ্ত রহিয়াছ এবং তুমি মঙ্গলময়। তোমার এই জগতে মঙ্গল ভিন্ন অপর কিছু কোথাও থাকিতে পারে না। বুদ্ধির দিক হইতে ইহাকে সত্য বলিয়া বেশ ধারণা করিতে পারি। কিন্তু হৃদয়ের দিক হইতে, উপলব্ধির দিক হইতে সন্দেহ মুক্ত হইতে পারিতেছি না। ইহাই তো আমার কলুষিত চিত্তের ছলনা। আমার চিত্ত এখনও সম্পূর্ণভাবে নির্মল হইল না বলিয়াই তোমার চিরমঙ্গল প্রভাব আমার হৃদয় দর্শনে প্রতিফলিত হইতেছে না। সুতরাং আমার মন যে অন্ধকারাচ্ছন্ন, ইহা শুধু আমার মলিন মনেরই ভ্রান্তিমোহ। হে প্রভো! আমাকে জানাইয়া দাও কি উপায়ে আমি এই বিভ্রান্তি হইতে মুক্ত হইতে পারি।”

পাঠক, কতোটা বাস্তব ও সময়োচিত উপলব্ধি হলে এমন ভাবনা একজন মানুষের মনে উদয় হয়। আমাদের সচরাচর জ্ঞানে যা উপলব্ধি করি, দেখি, তা কি আদৌ অনুভব করতে পারি? আত্মস্থ করতে পারি? অনেক ভাবনা হাজির হয়। আকুল হয়ে ওঠে চিত্ত। কিন্তু এমন ভাবনাই সহজ করে লিখে গেছেন জ্ঞানতাপস যোগেশ চন্দ্র সিংহ।

আমরা অনেক সময় ভুলে যাই আমাদের নিজেদের। নিজের অস্তিত্বকে। নিজের স্বকীয়তাকে। এটা আমাদের দাম্ভিকতা। অহংবোধ। প্রাচুর্য। এই বিষয়াবলীই নিয়ে যোগেশ চন্দ্র সিংহ লিখেছেন: “মানুষের সংসারে আজ কত মিথ্যা, কত কপটতা, কত অহঙ্কারের আস্ফালন। পথে বাহির হইলে, মানুষ দেখিলে তোমার সম্মুখে আছি বলিয়া মনে হয় না কেন!”

ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন যোগেশ চন্দ্র সিংহ। কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণ রীতিমতো দার্শনিকের ন্যায়। মানুষের নানান চরিত্র কিংবা মানব মনের যে বিচিত্র রূপ তা আবিষ্কার করা এবং একই সাথে সৃষ্টিকর্তার যে রহস্যময় যোগাযোগ তা কেবল কিছু মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আমাদের মতো সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয় তা এই লেখনীতে সুস্পষ্ট।

যোগেশ চন্দ্র সিংহ সেই ক্ষণজন্মা মানুষ, যিনি ভেবেছিলেন মানুষকে নিয়ে। মানুষের স্বরূপ উন্মোচন করতে বিভিন্ন ভাবে গবেষণা করেছেন। সৃষ্টিকর্তার নিকট আকুল হয়ে জানতে চেয়েছেন।

তিনি আরেক অধ্যায়ে লিখেছেন : “হে বিশ্বনাথ! তোমাকে লইয়া মানুষ যেন পুতুল খেলা খেলিতেছে। আর তুমিও যেন সকলের সান্নিধ্যে থাকিয়া, সকলের অন্তরের অন্তরে, সকলেরই আত্মারূপে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া, মানুষের চপলতার বিচিত্রিতা দেখিয়া, গোপনে নিভৃতে হাসিতেছ। যাঁহারা চিরজন্ম শুধু তোমাকেই সত্য বলিয়া জানিয়াছিলেন প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য চেষ্টা করেন নাই; অথবা তোমার নামে হাটের মাঝে বিচিত্র খেলা দেখাইয়া, অর্থ লালসায়, সরল মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ লইয়া বৈষয়িক স্বার্থোদ্ধারের প্রচণ্ড বিভীষিকায় মাতিয়া উঠেন নাই।” কী অসাধারণ অনুভূতির প্রকাশ ঘটালেন এই লেখনীতে। তিনি যেন দিব্যচোখে দেখিলেন, মানুষের ভেতরের স্বরূপ। একদিকে যেমন সত্যি কথা, অন্যদিকে করুণ অবস্থা দেখতে পাই।

যোগেশ চন্দ্র সিংহ আজীবন শিক্ষা নিয়ে নিমগ্ন ছিলেন। তাঁর এই শিক্ষা শুধু যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, তা তাঁর বিভিন্ন রচনায় উঠে এসেছে। তাঁর শিক্ষা ভাবনা কোন পর্যায়ের ছিল, তা বুঝতে পারি এই বক্তব্যে : “Time has come when some sort of harmony must be established between the new world that is drawing about us and system of education is now, for all practical purposes, divorced from life  our mind are now starved and distorted there is only a solemn parade for preparing the present generation for the larger and fuller life that lies ahead.”( ১৯৪৬ সালে যোগেশ চন্দ্র সিংহ চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষক সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে এই কথাগুলো বলে গেছেন।)

শিক্ষার সাথে সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে যোগেশ চন্দ্র সিংহের নানান ভাবনাও দেখতে পাই। ‘যুগের সীমান্তে’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: “আজ আমরা সংস্কৃতির উৎকর্ষের জন্য বেশ মাতিয়া উঠিয়াছি। কিন্তু সংস্কৃতি বলিতে শুধু শিল্পচর্চা বুঝায় না। যথার্থ সংস্কৃতির মূল রহিয়াছে জীবনতন্ত্রে। যেজীবন যেই পরিমাণে মুক্ত হইয়াছে আত্মকেন্দ্রিকতা হইতে সেই পরিমাণেই জীবন সার্থক। ইংরেজ কবি টি.এস. ইলিয়ট বলিয়াছেন– “ঈঁষঃঁৎব রং ষরাব ৎবষরমরড়হ. ইহা অপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান কথা সংস্কৃতি সম্বন্ধে কেহ বলিয়াছেন কিনা জানি না। জীবন ও সংস্কৃতি দুই পৃথক বস্তু নহে। জীবনের মধ্যে রূপায়িত হইয়া সংস্কৃতি আপন সত্তার গতিময় বলিষ্ঠতা প্রমাণ করে।” যতই পড়ি তাঁর রচনা, ততই যেন মোহে আবিষ্ট হই। সেই মোহ নিজে কে জানার, নিজেকে সৃষ্টিকর্তার কাছে সমর্পিত করার, মানব জীবনের নানান স্বরূপ জানার। সংস্কৃতি নিয়ে এমন বিশ্লেষণ, নতুন করে ভাবতে শেখায়।

মৃত্যু নিয়েও যোগেশ চন্দ্র সিংহের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন তাঁর লেখায় লিখে গেছেন। তিনি লিখেছেন: “মৃত্যু যখন ঘনাইয়া আসিবে, এ জীবনের যত খেয়াল খুশীর খেলা ফুরাইয়া যাইবে, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যখন মন্থর হইতে থাকিবে, চোখের দৃষ্টির উপরে যখন আবরণ নামিয়া আসিবে, অঙ্গে প্রত্যঙ্গে যখন হয়তো বেদনা অনুভূত হইবে, তখন হে ভগবন, হে পরম শঙ্খ হরণ, হে সর্বহর মৃত্যু, হে আনন্দময়, তোমার মধ্যে যেন আমার মন নিবেদিত থাকে। সংসার জীবনে সারাক্ষণ যে সকল তুচ্ছ বিষয়ের পশ্চাতে ছোটাছুটি করিলাম, তাহাও যখন বিস্মৃতিতে ডুবিয়া যাইবে, মান অপমানের কথা, হর্ষবিষাদের কথা সমস্তই যখন অস্পষ্ট অন্ধকারে বিলীন হইবে, নিজের নামের স্মৃতিও যখন ম্লান হইয়া পড়িবে, তখন সেই করুণ মুহূর্তে, হে ভগবন! এই অসহায় জীবন পথিকের প্রাণে সিঞ্চন করিও তোমারই করুণা ধারা।”

আমরা দেখতে পাই না। সৃষ্টিকর্তা হয়তো বা এভাবেই করুণাধারায় সিক্ত করে তাঁর আত্মাকে নিয়ে গিয়েছেন পরলোকে। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ সাল। দিবাগত ৭.৫০ মিনিটে যোগেশ চন্দ্র সিংহ পরলোকে যাত্রা করেন। সেই অন্তিম মুহূর্ত আজও মনে পড়ে। আজ যোগেশ চন্দ্র সিংহের ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। বড়বাবার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিকর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণে কৃষকদের আশার আলো ‘মিনি কোল্ড স্টোরেজ’
পরবর্তী নিবন্ধসালিশে অপমানের পর গলায় ফাঁস, ৯ দিন পর গৃহবধূর মৃত্যু