‘আমার মেয়েটা যেন বেঁচে থাকে’

ভালো থাকার আশায় গিয়েছিল গৃহকর্মী হয়ে, দেড় বছর পর ফিরল ক্ষত-বিক্ষত শরীরে

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি | মঙ্গলবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ

হাসপাতালের মেঝেয় শুয়ে আছে ১১ বছরের শিশু তানিয়া। স্কুলের বারান্দায় যার উচ্ছ্বাসে মেতে থাকার কথা সে এখন জীবনের বিভীষিকায় কাতরাচ্ছে। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন, মাথায় সেলাই, পিঠে গভীর ক্ষত। জীবন এখন মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। অপুষ্টি আর নির্যাতনে হাঁটার শক্তি হারিয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা তানিয়াকে দেখে আঁতকে উঠছেন অনেকে। তানিয়া ভালো করে কথাও বলতে পারছে না।

অভাবের সংসারে বাবার বোঝা কিছুটা কমবে, মেয়েটিরও হয়তো ভালো ভবিষ্যৎ হবেএই আশায় প্রায় দেড় বছর আগে সাড়ে নয় বছর বয়সি তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন দিনমজুর বাবা বেলাল হোসেন। কিন্তু ভালো থাকার সেই আশা কাল হয়ে দাঁড়ায় শিশুটির জীবনে। দেড় বছর পর সে বাড়ি ফিরেছে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে।

তানিয়ার বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামে। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার মা মারা যান। স্ত্রীকে হারানোর পর দুই মেয়েকে নিয়ে কঠিন হয়ে পড়ে বেলালের সংসার। তখন স্থানীয় একটি মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত তানিয়া। একপর্যায়ে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন বেলাল। প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদ সংলগ্ন একটি বাসায় এক নারীর কাছে তানিয়াকে দেওয়া হয়। পরে ওই নারী তাকে ঢাকায় তার বোনের বাসায় পাঠান।

তানিয়ার ভাষ্য, ঢাকার মিরপুরের একটি বাসায় তাকে রাখা হয়েছিল। সেখানে গৃহকর্তার নাম রাসেল এবং গৃহকর্ত্রীর নাম সুবনা বলে জানিয়েছে সে। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান এবং তার স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

তানিয়ার অভিযোগ, ওই বাড়িতে শুরু থেকেই তাকে ভয়ভীতি ও নির্যাতনের মধ্যে রাখা হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুন্তি দিয়ে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। প্রায় প্রতিদিন তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

কয়েকদিন আগে মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত করার পর তানিয়াকে ঢাকার ওই বাসা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে তার বাবা সেখানে ছুটে যান। পরে শুক্রবার রাত ৩টার দিকে মেয়েকে নিয়ে খাগড়াছড়িতে ফেরেন তিনি।

খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।

তানিয়ার বাবা বেলাল হোসেন বলেন, আমার মেয়েটা যেন বেঁচে থাকে, উন্নত চিকিৎসা পায়। একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায় মেয়েকে দূরে পাঠিয়েছিলাম। এখন সুস্থ শরীরে তাকে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিতে চাই। এদিকে এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থল ঢাকায় হওয়ায় এখানে মামলা গ্রহণ বা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।

খাগড়াছড়ির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, যে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাকে দেখেছি। তার বয়স ১১ বছর। সে শিশু হিসেবে আইনের সুরক্ষা পাবে। সে পেশায় গৃহকর্মী। গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা আছে। আইন অনুযায়ী সে সুরক্ষা পেতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা.
পরবর্তী নিবন্ধমৃত্যুর তথ্য তদন্ত করে দেখা হবে : বিভাগীয় কমিশনার