অপারেটর নিয়োগ হয়নি, অব্যবহৃত ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

সাগরে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাসের অবকাঠামো প্রস্তুত, খালি পড়ে আছে দুই লাখ টন মজুত সক্ষমতাও

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট ছোট লাইটার জাহাজে তেল স্থানান্তর করে কর্ণফুলী নদীপথে চট্টগ্রামে আনার পুরোনো পদ্ধতি বদলে দিতে কঙবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণ করা হয়েছে দেশের প্রথম সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ব্যবস্থা। বঙ্গোপসাগরে স্থাপিত ভাসমান মুরিং বয়া থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস, মহেশখালীর ট্যাংকে মজুত এবং সেখান থেকে আবার পাইপলাইনে চট্টগ্রামের ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশাল এই অবকাঠামো। প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায়। কিন্তু নির্মাণ শেষ, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল এবং ছয়টি বিশাল স্টোরেজ ট্যাংকসহ ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রস্তুত থাকার পরও বাণিজ্যিকভাবে চালু করা যায়নি প্রকল্পটি। প্রায় আড়াই বছর ধরে পড়ে আছে দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা। মূলত অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের (ওঅ্যান্ডএম) জন্য দক্ষ অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়াই আটকে রেখেছে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এক লাখ টন ক্রুড অয়েল খালাসে যেখানে লাইটারিং পদ্ধতিতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে, সেখানে এসপিএমের মাধ্যমে মাত্র দুই দিনে তা করা সম্ভব। ডিজেলের ৬০৭০ হাজার টন চালান খালাস করা যাবে প্রায় ২৮ ঘণ্টায়। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্যই ছিল সময়, পরিবহন ব্যয় ও তেল অপচয় কমানো।

ইস্টার্ণ রিফাইনারির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কমিশনিংয়ের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের মার্চে গভীর সমুদ্র থেকে ক্রুড অয়েল খালাস করে মহেশখালীর ট্যাংকে নেওয়া এবং সেখান থেকে পাইপলাইনে ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে পৌঁছানো হয়েছে। ৯ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার টন ক্রুড অয়েল পাইপলাইনে পরিবহন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় পাইপলাইনের কমিশনিংও সম্পন্ন হয়। কিন্তু পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত অপারেশন শুরু হয়নি। সূত্র জানায়, সরকারি হিসাবে এসপিএম প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, সাবমেরিন ও অনশোর পাইপলাইন, মহেশখালীতে পাম্পিং স্টেশন ও ট্যাংক ফার্ম এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত তেল পরিবহনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। মোট পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য ২২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে অফশোর ও অনশোর অংশ মিলিয়ে গভীর সমুদ্র থেকে মহেশখালী এবং মহেশখালী থেকে ইস্টার্ণ রিফাইনারি পর্যন্ত তেল পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে।

মহেশখালীর প্রায় ৯০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত পাম্পিং স্টেশন ও ট্যাংক ফার্মে রয়েছে ছয়টি বড় স্টোরেজ ট্যাংক। তিনটি ট্যাংক ক্রুড অয়েলের জন্য এবং তিনটি ডিজেলের জন্য। ইস্টার্ণ রিফাইনারির প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ক্রুড অয়েল ট্যাংকের নেট ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার টন এবং প্রতিটি ডিজেল ট্যাংকের নেট ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার টন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ট্যাংকগুলোর মোট ব্যবহারযোগ্য মজুত সক্ষমতা প্রায় দুই লাখ টনের কাছাকাছি। শুধু তেল পরিবহনের দ্রুত ব্যবস্থা নয়, জ্বালানি সংকটের সময় দেশের জন্য বাড়তি মজুত সুবিধাও তৈরি হয়েছে এখানে। অথচ সেই সক্ষমতাও পড়ে আছে অব্যবহৃত।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল বড় মাদার ট্যাংকারে করে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে আনা হয়। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ও ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ট্যাংকার সরাসরি ইস্টার্ন রিফাইনারির জেটিতে যেতে পারে না। ফলে গভীর সমুদ্রেই মাদার ভেসেল থেকে তেল ছোট লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। পরে লাইটার জাহাজে করে কর্ণফুলী নদীপথে তা চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। এই ব্যবস্থায় একদিকে সময় বেশি লাগে, অন্যদিকে একাধিকবার তেল হ্যান্ডলিং করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং তেল অপচয় হয়। চুরির ঘটনাও ঘটে। এসপিএমের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সেই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া বাদ দেওয়ার পাশাপাশি চুরি ও অপচয় রোধ করা।

প্রকল্পটি চালু হলে মাদার ভেসেল বঙ্গোপসাগরে এসপিএম বয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হবে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংকে যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মহেশখালী থেকে পৃথক পাইপলাইনে তা ইস্টার্ণ রিফাইনারিৎ পাঠানো হবে। এতে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দুই দিনে খালাস করা সম্ভব হবে, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে সময় লাগে ৮১০ দিন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণ সক্ষমতায় এসপিএম চালু করা গেলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বর্তমানে লাইটার জাহাজে তেল পরিবহনে বিপিসিকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ইস্টার্ণ রিফাইনারি আমদানি করা তেল সমুদ্র থেকে নিজেদের ট্যাংকে আনতে লাইটারেজ পরিবহনে মাসে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা ব্যয় করে। এসপিএম চালু না হওয়ায় এই সাশ্রয়সহ প্রকল্পের সম্ভাব্য সম্ভাবনা মাঠে মারা পড়ছে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে জিটুজি সহযোগিতার আওতায়। প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে অনেক কম থাকলেও বিভিন্ন পর্যায়ে তা বেড়ে শেষ পর্যন্ত ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় দাঁড়ায় বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জানিয়েছে, ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন, ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক পুরোপুরি তৈরি হলেও তা অব্যবহৃত পড়ে আছে।

এসপিএমের মতো বিশেষায়িত অবকাঠামো পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় প্রকল্পটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে এ ধরনের গভীর সমুদ্রের তেল খালাস ও পাইপলাইন পরিচালনার সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকায় শুরু থেকেই বিদেশি দক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য ইতোপূর্বে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে (সিপিপিইসি) এসপিএমের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি বিশেষ আর এগোয়নি। এরপর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত অপারেটর নিয়োগ সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পটি অব্যবহৃত পড়ে আছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসপিএম চালু হলে বছরে বিপুল পরিমাণ ক্রুড অয়েল ও ডিজেল দ্রুত খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব হবে। ইস্টার্ণ রিফাইনারির সমপ্রসারণের সঙ্গে ভবিষ্যতে এই অবকাঠামোর ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসপিএমকে তেল পরিবহনের পাশাপাশি দেশের কৌশলগত জ্বালানি মজুত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা জরুরি। লাইটারেজে তেল পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে এবং তেল স্থানান্তরের সময় অপচয়ও হচ্ছে। পাইপলাইন চালু থাকলে সরাসরি পাম্প করে তেল রিফাইনারিতে নেওয়া সম্ভব হতো। পাশাপাশি মহেশখালীর দুই লাখ টনের মজুত সক্ষমতা ভবিষ্যতে কৌশলগত মজুত হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব হতো। যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অনেক বড় ভূমিকা রাখতো বলেও তারা মন্তব্য করেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, লাইটারেজের মাধ্যমে তেল পরিবহনের তুলনায় পাইপলাইন ব্যবস্থা আধুনিক, দ্রুত ও সাশ্রয়ী। এত বড় অবকাঠামো তৈরি হয়ে পড়ে থাকলে কেন তা চালু হয়নি, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করা উচিত।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি চালুর ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে অপারেটর নিয়োগ করে যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পটি চালু করার চেষ্টা চলছে।

এসপিএম পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসিএলসি) গঠন করা হয়েছে। তবে কোম্পানিটির নিজস্ব প্রয়োজনীয় জনবল ও অপারেশনাল দক্ষতা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত ওঅ্যান্ডএম ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষিত জনবলের কাছে কার্যক্রম হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিল্পে গ্যাসের সরবরাহ দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে আজ থেকে
পরবর্তী নিবন্ধমইজ্জ্যারটেকে চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ