চট্টগ্রামে ব্যবসায়ী ও তার বন্ধুকে আটক করে ভুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একজন সহকারী কমিশনার (এসি) ও দুই সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) প্রত্যাহার করা হয়েছে। অভিযোগের তদন্তে ইতোমধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তারা হলেন সিএমপির ল অ্যান্ড অর্ডার ইন্টেলিজেন্স সেলের সহকারী কমিশনার শরিফুল আলম সুজন ও এএসআই বশির উদ্দিন এবং সিএমপির রেশন স্টোরে কর্মরত এএসআই সুফিয়ান। তাদের মধ্যে এসি শরিফুল আলমকে সিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। অপর দুই এএসআইকে ক্লোজ করে দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পুলিশ হেফাজতে থাকা এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করছেন পিওএম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. বদিউজ্জামান। তাকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
অভিযোগকারী ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে নগরীর হালিশহরের কে– ব্লক এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে এবং তার বন্ধু মনসুর আলীকে সাদা পোশাকে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্য তুলে নিয়ে যান। তাদের সঙ্গে শাকিলের টয়োটা করোলা গাড়িটিও নেওয়া হয়। পরে দুজনকে সিএমপির ল অ্যান্ড অর্ডার ইন্টেলিজেন্স সেলের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
শাকিল অভিযোগ করেন, সেখানে তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি কর্মকর্তারা নিজেদের কাছে স্থানান্তর করেন বলে অভিযোগ করেন তিলি। পরে ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখানোর পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে জুয়া আইনে মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে তার অ্যাকাউন্ট থেকে তিন দফায় ১০ হাজার ৮৬৪ মার্কিন ডলার স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন শাকিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এরপর রাত আনুমানিক ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে তিন কনস্টেবল তাকে সিএমপির কাছাকাছি একটি ব্যাংকের বুথে নিয়ে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সেখানে পাঁচ দফায় মোট ৪ লাখ টাকা উত্তোলন করতে বাধ্য করা হয়। পরে মোবাইলের লেনদেনের নোটিফিকেশনেও ৮০ হাজার টাকা করে পাঁচ দফায় টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লেনদেনগুলো রাত ১০টা ৫২ মিনিট থেকে ১০টা ৫৮ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
শাকিলের অভিযোগ, ল অ্যান্ড অর্ডার ইন্টেলিজেন্স সেলের কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় তার একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেও আরও ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে নগদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি মিলিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আটক দুই ব্যক্তি জানান, রাত ১২টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এর আগে তাদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে নেওয়া হয়। একটি সাদা কাগজে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া এবং তাদের ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল খাতুনগঞ্জে পলিপ্রোপিলিন (পিপি) কাঁচামালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি পটিয়ায় তার একটি কৃষি খামার রয়েছে। ঘটনার পর তিনি সিএমপির তদন্ত কমিটির কাছে মৌখিকভাবে বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ভার্চুয়াল মুদ্রা অনুমোদিত কোনো বৈদেশিক মুদ্রা বা বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত নয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭–এর আওতায় এ ধরনের লেনদেন অনুমোদিত নয়।
পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগে একসঙ্গে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনায় সিএমপিতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।












