চট্টগ্রাম কারাগারে ৬৩ বিদেশি,পুরোনো সংকটে নতুন চাপ

নেজাম উদ্দিন আবির | রবিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সমপ্রতি চীনা, লাওস, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও নেপালের ৬৩ নাগরিক আটক হয়ে আসার পর নতুন করে সামনে এসেছে কারাগারটির দীর্ঘদিনের জায়গা ও আবাসন সংকট। বিদেশি হাজতিদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করতে গিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, ১৪ দশমিক ৪০ একরের পুরোনো এই কারাগারটি ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বন্দির চাপ বহন করছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৬৩ বিদেশি নাগরিকের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, ভিয়েতনামের ১ জন ও নেপালের ১ জন। তাদের মধ্যে ১৯ জন নারী ও ৪৩ জন পুরুষ। মায়ের সঙ্গে রয়েছে পাঁচ বছরের একটি শিশুও।

বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান, কারাবিধি এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা রেখে পুরুষ ও নারী হাজতিদের জন্য পৃথক দুটি ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন করে বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। খাবার, আবাসিক পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি শুধু বিদেশি নাগরিকদের আবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা কারাগারে অবস্থানকালে বাংলাদেশের কারাব্যবস্থা সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা নিয়ে যাবেন, সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তাই জায়গার তীব্র সংকটের মধ্যেও তাদের জন্য তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা উপমহাপরিদর্শক মোঃ ছগির মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বন্দি থাকায় আবাসন, চিকিৎসা, খাবার, নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ৬৩ বিদেশি বন্দি আসার পর বিষয়টি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মান ও কারাবিধি অনুসরণ করে পৃথক ওয়ার্ড, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সাময়িকভাবে এই ব্যবস্থা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বন্দিদের সংখ্যা ও ধরন বিবেচনায় নিয়ে নতুন কারাগার নির্মাণ এবং বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিদের জন্য পৃথক অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

তবে ৬৩ বিদেশির আগমন মূল সংকট তৈরি করেনি; বরং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটকে আরও দৃশ্যমান করেছে। কারাগারটিতে প্রায় ২ হাজারের কিছু বেশি বন্দি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৪৯ জন; আবার ২০১১ সালের প্রকল্পপরিকল্পনায় ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জন উল্লেখ করা হয়েছিল। বর্তমানে বন্দি রয়েছে ৭ হাজারেরও বেশি।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৫ সালে চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির পাড়ে ১৪ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর কারাগারটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯০ সালে অবকাঠামো উন্নয়ন ও ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও মূল জায়গার সংকট কাটেনি। বর্তমানে অতিরিক্ত বন্দির কারণে আবাসন, চলাচল, চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ।

কারা সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মোট হাজতি বন্দির প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মাদক মামলার আসামি। বিভিন্ন মামলার বন্দিদের একই জায়গায় দীর্ঘদিন রাখায় পারস্পরিক যোগাযোগ ও অপরাধের কৌশল বিনিময়ের ঝুঁকিও রয়েছে।

আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার বন্দির জন্য প্রায় ৬৮ একর জমি প্রয়োজন বলে পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হচ্ছে। বন্দিপ্রতি ১৩৬ বর্গফুট (৩৬ বর্গফুট ঘুমানোর জন্য আর অন্যান্য সুযোগসুবিধার জন্য ১০০ বর্গফুট) হিসাবে ২ হাজার বন্দির জন্য প্রয়োজন ২,৭২,০০০ বর্গফুট। এর বাইরে প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো মিলিয়ে মোট জমির প্রয়োজন প্রায় ৬৮ একর পর্যন্ত হতে পারে। পরিকল্পনায় প্রায় ৯৪ শতাংশ পুরুষ ও ৬ শতাংশ নারী বন্দির জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ তিনটি নতুন কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। মাদক মামলার আসামি, মহানগর ও জেলার বন্দিদের জন্য পৃথক অবকাঠামোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য পৃথক বন্দিশালা নির্মাণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সামপ্রতিক সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে এবং বেশ কিছু আসামি আটক হয়েছে। পরিস্থিতি আগেও খারাপ ছিল। এজন্য জঙ্গল সলিমপুরে একটি আধুনিক কারাগার নির্মাণের কার্যক্রম চলছে। তবে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকায় এখনো পুরোপুরি কাজ শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, সমপ্রতি আটক বিদেশি হাজতিদের খাবারসহ মানবিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন কারাগারে বিদেশি নাগরিকদের জন্য আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় রাখা হবে। পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণ হওয়ায় পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা ও আশপাশে গাজীপুরে চারটি এবং কেরানীগঞ্জে তিনটি নতুন কারাগার চালু হলেও চট্টগ্রামে নতুন কোনো কারাগার নির্মিত হয়নি।

চট্টগ্রাম৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, চট্টগ্রাম কারাগারে ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ বন্দি থাকায় নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সমপ্রতি গ্রেপ্তার হওয়া বিদেশি নাগরিকদের নিয়েও কিছু সমস্যার কথা আমরা জানতে পেরেছি। সরকার বন্দিদের চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি কারাগারের ধারণক্ষমতার সংকট দূর করতে কাজ করছে। জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের কারা সমস্যার সমাধান হবে বলে আমরা আশা করছি। কারাগার শুধু শাস্তির স্থান নয়, বরং বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানএই ধারণাকে সামনে রেখে সরকার কাজ করছে।

৬৩ বিদেশি নাগরিকের জন্য পৃথক ওয়ার্ড, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বাড়তি সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করতে গিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের পুরোনো জায়গা সংকট আবারও সামনে এসেছে। তাই বিদেশি নাগরিকদের মর্যাদা ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি সাত হাজারের বেশি বন্দির দীর্ঘমেয়াদি চাপ মোকাবিলায় নতুন কারাগার নির্মাণ ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউখিয়ায় এক লাখ ইয়াবার চালান ফেলে পালাল পাচারকারীরা