একটি ভাসমান হাসপাতাল থেকে শুরু…

তাসমিন হাসনাত | শনিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

একটি হাসপাতাল তৈরি হবে, কিন্তু তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা থাকবে না। নদীর বুকে ভেসে সেটি যাবে এমন মানুষের কাছে, যাদের পক্ষে হাসপাতালে পৌঁছানোই প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের যমুনাব্রহ্মপুত্রের দুর্গম চরাঞ্চলে দুই দশকের বেশি আগে এই ধারণা থেকেই শুরু হয়েছিল রুনা খানের কাজ। একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে যে যাত্রা শুরু, তা এখন স্বাস্থ্যসেবা ছাড়িয়ে শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, জীবিকা, নাগরিক অধিকার ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৬ সালের র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান। ‘এশিয়ার নোবেল’ নামে পরিচিত র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের এ বছরের তিন বিজয়ীর একজন তিনি। অন্য দুজন সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চি। ৩১ আগস্ট ম্যানিলা থেকে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে র‌্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন। আগামী ১৫ নভেম্বর ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। ফাউন্ডেশন রুনা খানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও উপেক্ষিত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতা এবং ‘ফ্রেন্ডশিপ’ গড়ে তোলা ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সাহস, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়তার কথা।

রুনা খানের গল্পটি অবশ্য কোনো পুরস্কার দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৫৮ সালে জন্ম নেওয়া রুনা খান অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ও সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবেশে বড় হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে ছোট শিশুদের শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু। শিক্ষা, পর্যটন, ব্যবসা ও যোগাযোগবিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। কিন্তু বাংলাদেশের চরাঞ্চলের মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখা তাঁর কাজের গতিপথ পাল্টে দেয়। চর এমন এক ভূগোল, যেখানে আজ যে জমি আছে, নদীভাঙনে কাল সেটি নাও থাকতে পারে। বন্যা ও ভাঙনে বসতি সরে যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। স্থায়ী হাসপাতাল বানালেও বহু মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো কঠিন। রুনা খান সমস্যাটিকে তাই প্রচলিত কাঠামোর ভেতর থেকে দেখেননি। মানুষ যদি হাসপাতালে যেতে না পারে, হাসপাতালই মানুষের কাছে যাবেএই সহজ কিন্তু সেই সময়ের জন্য ব্যতিক্রমী ধারণা থেকেই ২০০২ সালে যমুনার চরে চালু হয় ফ্রেন্ডশিপের প্রথম হাসপাতাল জাহাজ। একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ ‘ফ্রেন্ডশিপ’।

শুরুটা ছিল খুব ছোট। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে রুনা খান ও তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে পারেন, শুধু অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করলেই একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন বদলায় না। অসুস্থতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশুদ্ধ পানির অভাব, দারিদ্র্য, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা, দুর্যোগ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা। একটি সমস্যার সঙ্গে অন্যটি যুক্ত। ফলে ফ্রেন্ডশিপও ধীরে ধীরে একক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প থেকে সমন্বিত উন্নয়নব্যবস্থার দিকে যায়। সংস্থাটি নিজেদের এখন ‘সোশ্যাল পারপাস অর্গানাইজেশন’ বা সামাজিক উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়। আজ সেই একটি হাসপাতাল জাহাজের জায়গায় কাজ করছে সাতটি হাসপাতাল জাহাজ ও দুটি স্থলভিত্তিক হাসপাতাল। আছে পাঁচ শতাধিক স্যাটেলাইট ও মোবাইল ক্লিনিক এবং শত শত প্রশিক্ষিত কমিউনিটি মেডিকএইড। স্থানীয় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজ এলাকার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করার ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। ফ্রেন্ডশিপের হিসাবে, তাদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এখন প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে।

কিন্তু সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভবত মডেলটি। দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জন্য শহরে তৈরি কোনো সমাধান সরাসরি নিয়ে যাওয়ার বদলে স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছে ফ্রেন্ডশিপ। রুনা খান নিজেও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, কাজের নকশার কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে। চরাঞ্চলে স্থায়ী হাসপাতাল কার্যকর নয় বলেই হাসপাতাল ভাসমান; যেখানে নিয়মিত শিক্ষক পাওয়া কঠিন, সেখানে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা ও সৌরবিদ্যুৎনির্ভর শিক্ষাকেন্দ্রের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দর্শন পরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায়। নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা উপকূলীয় লবণাক্ততা বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বর্তমানের অভিজ্ঞতা। ‘ফ্রেন্ডশিপ’ তাই দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই মানুষের সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে। ম্যানগ্রোভ বনায়ন, উদ্ধার ও ত্রাণে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ এবং জলবায়ুসহনশীল জীবিকার উদ্যোগ তার অংশ। সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি ২০০ হেক্টরের বেশি এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন করেছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ১০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাকেও একই কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। ১৩৭টি সাসটেইনেবল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট হাবের মাধ্যমে দুই লাখের বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে পুরস্কার ঘোষণার সময় প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি প্যারালিগ্যালদের মাধ্যমে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত দক্ষতা সংরক্ষণেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এখানে রুনা খানের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। উন্নয়নকে তিনি কেবল সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সম্পর্ক হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাজের ভাষায় বারবার ফিরে আসে ‘dignity’ বা মর্যাদার ধারণা। ফ্রেন্ডশিপের ঘোষিত মূল্যবোধেও সততা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার, মান ও আশার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন দরিদ্র মানুষকে শুধু সেবা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, নিজের জীবন পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে দেখার চেষ্টা রয়েছে এই মডেলে। বর্তমানে সংস্থাটির কর্মীদের বড় অংশই আসে যেসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে তারা কাজ করে, সেখান থেকে।

পুরস্কারের প্রতিক্রিয়াতেও ব্যক্তিগত অর্জনের বদলে সেই সমষ্টির কথাই বলেছেন রুনা খান। তাঁর ভাষায়, কোনো নেতা একা পথ চলেন না। তাই এই পুরস্কার তিনি গ্রহণ করছেন সেইসব উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং ফ্রেন্ডশিপের কর্মীদের পক্ষ থেকে, যারা দীর্ঘ এই পথচলার অংশ। স্বীকৃতিটিকে তিনি আনন্দের পাশাপাশি ‘বড় দায়িত্ব’ হিসেবেও দেখছেন। র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার চালু হয় ১৯৫৮ সালে। ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র‌্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত এই পুরস্কার এশিয়ায় জনসেবা, সামাজিক নেতৃত্ব ও মানবিক কাজের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। রুনা খানের পুরস্কার তাই একজন ব্যক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অবশ্যই, কিন্তু তাঁর গল্পটির গুরুত্ব সম্ভবত অন্য জায়গায়।

দুই দশকের বেশি আগে তিনি এমন একটি জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়েছিলেন, যাদের সমস্যার একটি বড় কারণই ছিল তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন। সেই সমস্যার উত্তর হিসেবে তিনি মানুষকে স্থানান্তর করেননি, বদলে দিয়েছিলেন সেবার কাঠামো। হাসপাতালকে তুলে দিয়েছিলেন জাহাজে। একটি ভাসমান হাসপাতাল থেকে শুরু হওয়া সেই চিন্তা আজ লাখো মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। রুনা খানের কাজ তাই দেখায়বড় পরিবর্তনের শুরু সব সময় বড় কোনো পরিকল্পনা দিয়ে হয় না। কখনো কখনো তার শুরু হয় খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন থেকে: যাদের কাছে প্রচলিত ব্যবস্থা পৌঁছায় না, তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্যবস্থাটিকেই বদলে দেওয়া যায় কি না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাঁশখালীতে জেএসইউএসের ডিজিটাল লিটারেসি প্রশিক্ষণ ও সনদ বিতরণ