গ্যাস সংকট: শুধু আপাতত ব্যবস্থাপনা নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী আত্মনির্ভর জ্বালানি কৌশল

দেলোয়ার মজুমদার | বৃহস্পতিবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানী সক্ষমতা হচ্ছে অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। যেই দেশ যত যোগ্যতার সাথে জ্বালানী নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করতে পারে সেই দেশ তত সমৃদ্ধ। দুর্ভাগা বাংলাদেশ এই নীতি প্রণয়নে বরাবরই উল্টো পথে হেঁটেছে। একসময় কর্তৃপক্ষ বলেছে, “বাংলাদেশে গ্যাস উদ্বৃত্ত, বাংলাদেশ গ্যাসের উপর ভাসছে, কাজেই গ্যাস রপ্তানি করে দিতে হবে।” জনগণ আন্দোলন করে এই রপ্তানি উদ্যোগ থামিয়েছিল। জনগণ তখন দূরদর্শিতা না দেখালে বর্তমান সংকট আরও একযুগ আগে থেকেই শুরু হত।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন, পরিবহন ও নগরজীবন বিপুলভাবে গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। অথচ যথাযথ ও কর্যকরি জ্বালানি নীতির অভাবে এইক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২.১৫ %ই গ্যাস নির্ভর। এই সময়ে আমাদের ৬২ টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয় বন্ধ নয় তার উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। তাই বসে থাকা তেল নির্ভর কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র (ব্যয় বহুল হলেও) আপদকালীন সময় মোকাবিলায় চালু করতে হবে। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়া এবং ১৫ আগস্ট এটি গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে এলএনজির কার্গো না আসায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যায়নি। এর মাধ্যমে আমাদের সীমাবদ্ধতা ফুটে উঠেছে। তাছাড়া দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে দীর্ঘসূত্রতা, আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে গ্যাস সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই সংকট শুধু দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি স্পষ্ট হয় মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কথায়। ‘দৈনিক প্রথম আলো’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “চাইলেই কাল সকালে বিদ্যুৎ আর গ্যাস দিতে পারব না”। তিনি অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রথম আলো কে বলেছেন, “আমি দুইবছর, চারবছরের কথা বলেছি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতা ও স্থিতিশীলতা থেকে সমৃদ্ধির দিকে যাওয়া বিষয়ে। এটা পর্যায়ক্রমে হবে। দুর্ভাগ্যবশত অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসও আমাদের নষ্ট হয়েছে। ১৮ মাস যে একটা সরকার ছিল, গ্যাসের দিকে তাদের নজরই ছিল না। সময়টা নষ্ট করেছে, আমাদেরও অনেক ক্ষতি করেছে। এতটা সময় বসে থেকে দেশটাকে আরও নিচে নিয়ে গেছে তারা। আমাদের এখন একসঙ্গে সব করতে হচ্ছে।” মাননীয় অর্থমন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য আমাদেরকে আশাবাদী করে, তিনি প্রকৃত সত্য আড়াল করেননি, এতে তিনি প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি আরো ধারনা দিয়েছেন এখন কোন কিছু শুরু করলেও কমপক্ষে দুবছর সময় লাগবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’কে বলেছেন, “আমাদের বর্তমানে যে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে, সেখানে আমরা সর্বোচ্চ ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি এলএনজি রাখতে পারি না। অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ভুল হয়েছে দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি বাতিল করা। এটি না করলে এখন অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করে সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দেয়া যেত।” বর্তমান অবস্থায় সাধ্যমত সাময়িকভাবে এলএনজি আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবহার এবং নবায়ন যোগ্য জ্বালানির প্রসারসবগুলোকে সমন্বিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি আত্মনির্ভর জাতীয় জ্বালানি কৌশল গ্রহণ জরুরি। এই ক্ষেত্রে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে তার সাধ্যের নিরিখে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এর সক্ষমতা বহুমাত্রিকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। বাপেক্সকে সাগরে অনুসন্ধানের জন্যেও প্রস্তুত করতে হবে।

বর্তমান গ্যাস সংকটের অবস্থা : বর্তমান হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০,০০০ MMCFD বা প্রায় ৩৮০৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ১,৬৫০ MMCFD। বিদ্যমান দুই FSRU থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১,১০০ MMCFD সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পর্যাপ্ত LNG সময়মতো কেনা ও সরবরাহ নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব হয় না, আর বর্তমান সংঘাতময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে এটি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে দেশীয় উৎপাদন ও FSRU মিলিয়ে প্রায় ২,৭৫০ MMCFD পর্যন্ত সরবরাহের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ আরও কম হতে পারে। ফলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১,৩০০,৪০০ MMCFDএর কাছাকাছি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।

নতুন গ্যাস অনুসন্ধান আজ শুরু করলেও আবিষ্কার, কূপ খনন, পরীক্ষা, প্রক্রিয়াকরণ ও জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করতে সময় প্রয়োজন। একইভাবে নতুন FSRU স্থাপনেও শুধু জাহাজ সংগ্রহ করলেই হয় না; LNG ক্রয়, মুরিং, পাইপলাইন ও গ্রিড সংযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রস্তুত করতে হয়। তাই সংকটের সমাধানকে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি এই তিন পর্যায়ে ভাগ করে এগোতে হবে।

প্রতিকারে গৃহীত ব্যবস্থা : দীর্ঘ উপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকার ইতোমধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধরে রাখা ও বাড়ানোর জন্য নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে, এই উদ্যোগকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের মধ্যে ফলপ্রসূ করতে হবে। একই সঙ্গে LNG আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। বিদ্যমান FSRUএর মাধ্যমে LNG পুনর্গ্যাসীকরণ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে LNG সংগ্রহের উদ্যোগ অব্যাহত আছে। ভবিষ্যতে LNG আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে নতুন FSRU ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে এই ক্ষেত্রে শুধু ভাসমান নয় স্থলভাগেও স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট তৈরি করতে হবে, যাকে Onshore LNG Terminal বা স্থলভিত্তিক এলএনজি রিসিভিং টার্মিনাল বলা হয়, এটি প্রাথমিক ভাবে ব্যয়বহুল হলেও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী। অন্যদিকে দুটি চুক্তি বাতিল করলেও নতুন কোন উদ্যোগ না নেয়া বর্তমান দুরবস্থার অন্যতম কারণ। তা ছাড়াও নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ধরে রাখা ও বাড়ানোর উদ্যোগ দীর্ঘদিন যাবত ছিল উপেক্ষিত। তবে সরকারের পদক্ষেপগুলোকে আরও সমন্বিত ও সময়ভিত্তিক করতে হবে। শুধু LNG আমদানি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; আবার শুধু নতুন গ্যাসের আশায় বসে থাকাও বাস্তবসম্মত নয়। তাই করণীয় সম্পর্কে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরছি।

তাৎক্ষণিক করণীয় : প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিদ্যমান গ্যাসের অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। সীমিত গ্যাস এমন খাতে দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে সর্বাধিক সুফল পাওয়া যায়। সর্বাগ্রে গ্যাস দিতে হবে সার উৎপাদনে, পরবর্তীতে দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে (কস্টইফেক্টিভ), এরপর বিবেচনায় নিতে হবে রপ্তানিমুখী ও বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পকে। গ্যাস নির্ভর কেপ্টিভ পাওয়ারে আপাতত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখাই শ্রেয়, কম দক্ষতার বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কম উৎপাদনশীল ব্যবহারে সাময়িক রেশনিং করা যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের উপর বাড়তি চাপ কমাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ উৎপাদনে আনা প্রয়োজন। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম ইদানীং প্রথম আলো কে বলেছেন, “তেল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বাড়তি বকেয়া এবং অন্যান্য সমস্যায় ক্রমাগত উৎপাদন কমিয়ে আনছে।” এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাথে বকেয়া সহ পিডিবির যেসব বিরোধ আছে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে তেল চালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে তেল নির্ভর কেন্দ্র উৎসাহিত না করাই ভালো।

CNGএর ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গাড়িতে গ্যাসের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে গণপরিবহন, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার যানবাহনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আবাসিক গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই হঠাৎ করে কমানোর পরিবর্তে নতুন সংযোগ বন্ধ রাখা এবং ধীরে ধীরে LPG ও বিদ্যুৎভিত্তিক রান্নার দিকে স্থানান্তর করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে গ্যাসের অপচয়, অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের লিকেজ ও সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যমান গ্যাস থেকেই অতিরিক্ত সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেশে এখন অনগ্রিড ১০৭৪.৭৩ মে:ওয়াট এবং অফগ্রিড ৩৭৭.৪৩ মে:ওয়াট মিলিয়ে ১৪৫২.১৬ মে:ওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। “টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)”র বরাতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড.বদরুল ইমাম জানিয়েছেন, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান সক্ষমতার মাত্র ৫০% উৎপাদন হচ্ছে । বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিলে এখান থেকেও কিছু বাড়তি উৎপাদন পাওয়া যাবে।

মধ্যমেয়াদে করণীয় : মধ্যমেয়াদে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে। স্থলভাগের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও অর্জিত সমুদ্রসীমার গ্যাস ব্লকগুলো থেকে সুসংবাদ নেই। ওদিকে পার্শ্ববর্তী সমুদ্রাঞ্চলে মিয়ানমার বেশ কিছু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় যদি গ্যাস পাওয়া যায়, তাহলে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের ব্লকগুলোতে গ্যাস না পাওয়ার কারণ নেই! প্রয়োজন ছিল শুধু জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে অবশ্যই বাপেক্সকে অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে, প্রথম দিকে বাপেক্স আউটসোর্সিং ও সার্ভিস কন্ট্রাক্ট এর সুযোগ ব্যবহার করে ধীরেধীরে স্বাবলম্বিতার দিকে এগুতে পারে। স্থলভাগে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাপেক্সকে আমলাতন্ত্র মুক্ত ও শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদে করণীয় : দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এজন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একই সঙ্গে গ্যাসকে অদক্ষভাবে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য কাজে ব্যবহারের পরিবর্তে যেখানে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার সম্ভব, সেখানে বিকল্প জ্বালানিতে যেতে হবে। শিল্পে শক্তি দক্ষতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গ্যাসের অপচয় কমানো জরুরি। জ্বালানি নীতিতে শুধু গ্যাস নয় গ্যাস, কয়লা, তেল, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এবং ভবিষ্যতের নতুন প্রযুক্তিকে বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

সবুজ ও নবায়যোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা : গ্যাস সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বর্জ্য থেকে জ্বালানি এবং অন্যান্য উপযোগী নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং বড় আবাসিক স্থাপনায় rooftop solar সমপ্রসারণ করা যেতে পারে। কৃষিতে সৌরচালিত সেচ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারও গ্যাস ও তরল জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে পারে। তবে সবুজ জ্বালানি নিয়ে অবাস্তব উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বাংলাদেশের বাস্তবতা, জমির সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও গ্রিড সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে হবে।

স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় উত্তরণ : জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু পর্যাপ্ত গ্যাস থাকা নয়; বরং প্রয়োজনের সময় নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি পাওয়ার নিশ্চয়তা। এজন্য দেশীয় অনুসন্ধান, LNG আমদানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় দরকার। জ্বালানির অপচয় ও অপব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।

বর্তমানে যদি গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ১,৩০০,৪০০ MMcf/d হয়, তাহলে একদিকে দ্রুত LNG আমদানি করে ঘাটতি সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের কাজ আজই শুরু করতে হবে। কারণ নতুন গ্যাস পাওয়া গেলেও তা উৎপাদনে আনতে সময় লাগে। একইভাবে নতুন FSRU ও Onshore LNG Terminal নির্মাণ বা স্থাপনেও সময় প্রয়োজন। তাই জ্বালানি কৌশলে তিনটি দিক নির্দেশনা ঠিক রেখে এগুতে হবে। ১. আজকের সংকটের সমাধান LNG, .আগামী দিনের নিরাপত্তার সমাধান দেশীয় অনুসন্ধান এবং ৩.ভবিষ্যতের টেকসই সমাধানে সবুজ নবায়ন যোগ্য জ্বালানি।

উপসংহার : বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকট কোনো সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ, কৃষি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত সংকট।

সরকারকে তাই একদিকে দ্রুত LNG আমদানি ও বিদ্যমান FSRUএর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; অন্যদিকে বাপেক্সকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করে স্থল ও সমুদ্রে ব্যাপক গ্যাস অনুসন্ধান চালাতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাসের অপচয় বন্ধ, খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সমপ্রসারণ করতে হবে।

সংকট ব্যবস্থাপনা দিয়ে আজকে টিকে থাকা সম্ভব, কিন্তু ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আজ থেকেই স্বনির্ভরতার পথে হাঁটতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতি হওয়া উচিত ‘যেখানে প্রয়োজন সেখানে গ্যাস, যেখানে সম্ভব সেখানে বিকল্প জ্বালানি, আর ভবিষ্যতের জন্য দেশীয় সবুজ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ।’

লেখক: প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৈনিক আজাদীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আঞ্চলিক শিকড়