(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
যত সুন্দরই লাগুক, যতই সাজিয়ে রাখুক, কবর তো কবরই। তাও আবার অতি প্রিয় একজন বন্ধুর কবর। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুর সাথে কাটানো নানা স্মৃতি একে একে মনে পড়ছিল। কত কথা, কত গল্প, কত হাসি, কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন–সবই আজ অতীত। সবই আজ কেবলই স্মৃতি! মনের গহিনে আমি যেন পুরোনো কোনো অ্যালবামের পাতা উল্টাচ্ছিলাম!
বহু দেশে গিয়েছি। কিন্তু কোনদিনই কখনো কোন প্রিয় মানুষের কবর সামনে নিয়ে এভাবে দাঁড়ানোর ঘটনা ঘটেনি। বন্ধুর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে খুবই অসহায় লাগছিলো। এ অনুভূতি অন্যরকম। বিদেশের মাটিতে কোনো প্রিয় মানুষের কবরের সামনে দাঁড়ানো যে কী কষ্টের তা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছিলাম। নিজের শহরের কবরস্থানে দাঁড়ালে চারপাশের পরিচিত দৃশ্য, পরিচিত মানুষ, পরিচিত ভাষা–সবকিছু মিলিয়ে শোকের মধ্যেও একটা আপন অনুভূতি থাকে। কিন্তু হাজার মাইল দূরের এক পাহাড়ী জনপদে বিশাল এই কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সেই আপন অনুভূতিটা পাচ্ছিলাম না। চারদিকে অপরিচিত মানুষ, তাদের ভাষা আলাদা, কৃষ্টি কালচার সবই অপরিচিত। এমন একটি স্থানে নিজের বন্ধুর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কেবলই মন পুড়ছিলো।
আহা, আমাদের কত আয়োজন, কতকিছুই না আমরা করি। কিন্তু শেষ ঠিকানাটি কতটা ছোট!
আমাদের ফেরার সময় হয়ে গেলো। বন্ধুপুত্র ইয়াস একটি উবার কল করলো। সে বললো, চার মিনিট পর গাড়ি আসবে। আমি আরো চার মিনিট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলাম। গাড়ি মসজিদের সামনে থেকে আমাদের তুলে নেবে।
ঠিকই চার মিনিটের মধ্যে গাড়ি এসে হাজির হলো। আবারো টেসলা, ইলেক্ট্রিক কার। ঝকঝকে একটি গাড়ি। এই গাড়িতে আমরা রেলওয়ে স্টেশন যাবো, ওখান থেকে ট্রেনে চড়ে ফিরবো হংকংয়ের বাসায়।
গাড়ি চলছে, বন্ধুকে কবরে একা রেখেই আমরা ছুটছি ব্যস্ত কোলাহলের দিকে। বিকেল হতে শুরু করেছে। চারদিকে পাহাড় আর সবুজ দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা।
এমআরটি স্টেশনে পৌঁছে টিপু ভাই কফি খাবো কিনা জানতে চাইলেন। আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়তেই দুইটি কফি এবং একটি আইসক্রিম নিয়ে ফিরে আসলেন। ইয়াস আইসক্রিম খাবে।
ইয়াস জানালো ১৫ মিনিট পরে ট্রেন আসবে। আমাদের কোন তাড়া নেই, ঘরে ফিরলেই হলো। টার্মিনালের চমৎকার বসার জায়গাটিতে বসে আছি আমরা, রয়ে সয়ে কফি খাচ্ছি।
ট্রেনে চড়ে বসলাম। পাশাপাশি তিনটি সিটে বসেছি আমরা। গল্প করছি। জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখা যাচ্ছিলো। সবুজে ঢাকা এক একটি পাহাড়, কোথাও কোথাও পাহাড়ের গায়ে বহুতল ভবন, বাড়িঘর।
ট্রেন থেকে নেমে আবাসিক এলাকার বাসে চড়ে ঘরে ফিরলাম। ভাবীর সাথে কবর জেয়ারতের গল্প করলাম। কবরটি এতো সুন্দর জায়গায় দেয়ার সুযোগ হওয়ায় সন্তোষও প্রকাশ করলাম। বিকেল গড়াতে শুরু করেছে, টায়ার্ডও লাগছে। কিছুক্ষণ ঘুমাবো বলে নিজের রুমে চলে গেলাম।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বন্ধু স্বপনের ফোনে ঘুম ভাঙ্গলো। সে আমি কি করছি জানতে চাইলো, আমাকে হংকং ঘুরিয়ে দেখাবে বলেও লোভ দেখালো।
নিচে নামতেই ভাবী চা নাস্তা দিলেন। সন্ধ্যার সময় এক কাপ চা শরীর মন বেশ ফুরফুরে করে দিলো। ভাবীকে স্বপন ফোন করেছে জানিয়ে ঘুরতে যাবো বলে জানালাম। ভাবী আমাকে আবাসিক এলাকার বাসের দুইটি টিকেট দিলেন। একটি দিয়ে যাবো, অপরটি ফিরে আসার সময় ব্যবহার করবো।
ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম এগোনোর পরই বাস স্টপেজ। একটি বাস দাঁড়িয়ে ছিল, আমি চড়ে বসলাম। আরো অনেকেই বসেছেন, নির্দিষ্ট সময়েই বাসটি এমআরটি স্টেশনের জন্য যাত্রা করবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবো।
এমআরটির অক্টোপাস টিকেট টিপু ভাই করে দিয়েছেন। পুরো হংকং চষে বেড়াতেও এখন আর আমার সমস্যা নেই। স্বপন আমাকে ট্রেনে চড়ে কোন স্টেশনে নামবো তা জানিয়ে দিলো।
ট্রেন ছুটছে, আরো তিন স্টপেজ পরেই আমাকে নামতে হবে। ট্রেনের দরোজার উপর পুরো লাইনের সবগুলো স্টেশনের নামই লেখা, কোন স্টেশনের পর কোন স্টেশনে ট্রেন থামছে সেটা বুঝা যাচ্ছে। ট্রেনের বগিতে থাকা সাউন্ড বক্সে মুখেও বলে দেয়া হচ্ছে। যেভাবে সবকিছু গুছিয়ে রাখা হয়েছে তাতে একেবারে নতুন কেউও ঠিকঠাকভাবে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, চাইলেও হারাবে না।
ট্রেন থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকাতেই স্বপনকে দেখতে পেলাম। সে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, আমার ভয় লাগছিলো যে, ঠিকঠাকভাবে নামতে পারিস কিনা। তোকে ওখান থেকে আনতে না গিয়ে অপরাধবোধে ভুগছিলাম।
আমি হাসলাম। বললাম, সবই তো বলে দিয়েছিস, হারাবো কেন?
সে আমতা আমতা করলো। হয়তো বুঝাতে চাচ্ছে যে, ব্যস্ত শহরের নতুন আগন্তক, আমার তো হারিয়ে যাওয়ারই কথা! স্টেশন থেকে বেরোতেই চোখ ধাঁধিয়ে দিলো ব্যস্ত শহর। শহরের রাত যেন আলোর এক বিশাল উৎসব। সুউচ্চ ভবনগুলোর জানালায় অসংখ্য বাতি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাড়িগুলোও যেন অন্ধকার আকাশে ছোট ছোট নক্ষত্র। নিচে ব্যস্ত রাস্তা। লাল, হলুদ, সাদা আলোয় ছুটে চলেছে গাড়ি। ফুটপাতে মানুষের ঢল। কেউ অফিস শেষে বাড়ি ফিরছে, কেউ কেনাকাটায় ব্যস্ত, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়, কেউ আবার ক্যামেরা হাতে এদিক ওদিকের ছবি তুলছে। বুঝতে পারছিলাম যে, এরাও আমার মতো পর্যটক।
মাত্র ঘন্টা কয়েক আগে দেখে আসা জনপদ এবং কবরস্থানের নীরবতার সঙ্গে এই দৃশ্যের কোনো মিলই নেই। অথচ এক নগরীতেই দুটোই বাস্তব, দুটোই জীবনের অংশ!
স্বপন দুই মগ কফি নিলো। আমরা কফিতে চুমুক দিতে দিতে হাঁটছিলাম। সে আমাকে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে নোনা বাতাসের গন্ধ পাচ্ছিলাম। প্রচুর লোকজন, প্রচুর পর্যটক। রীতিমতো কোলাহল চলছে। দূরে সাগরের বুকে ভাসমান জাহাজের আলো। পেছনে আলো, সামনে আলো, দূরে জাহাজেও আলো। চারদিকে এতো এত্তো আলোর মাঝে মনে হচ্ছিলো, হংকং একটি আলোর শহর। সমুদ্রকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল আলোকনগরী।
রাস্তার পাশে ছোট ছোট খাবারের দোকান। কোথাও ধোঁয়া উঠছে, কোথাও মানুষের ভিড়। অপরিচিত ভাষার শব্দ কানে আসছে। চীনা অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ডগুলোর একটি বর্ণও বুঝার উপায় নেই। এতো সাইনবোর্ড, কিন্তু কোথাও ইংরেজি চোখে পড়ছিলো না। সবগুলো হংকংয়ের ভাষায় লেখা, ছবির মতো। কিন্তু দেখতে ভালো লাগছিলো। হঠাৎ হঠাৎ ইংরেজির দু–একটি শব্দ চোখে পড়ে। নিজেদের ভাষাকে এরা কী পরিমাণ সমৃদ্ধ করেছে তা বেশ অবাক লাগছিলো। তাদের ভাবটা এমন যে, আমাদের সাথে ব্যবসা করবে ভালো কথা, আমাদের ভাষা শিখে আস। আমরা ইংরেজি শিখে তোমাদের সাথে ব্যবসা করতে যাবো না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইংরেজির চর্চা হলেও মাত্র কয়েক বছর আগেও চীন হংকং থাইল্যান্ডসহ পুরো অঞ্চলটিতে ইংরেজি অনেকটা নির্বাসিত ছিল। পৃথিবী যে কত বৈচিত্র্যময়, এমন শহরে না এলে হয়তো তা এতটা অনুভব করতাম না।
স্বপন আমাকে নিয়ে একটি ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ালো। চারপাশে প্রচুর মানুষ। সবাই কোথাও যাচ্ছে। কেউ হয়তো ঘরে ফিরছে, কেউবা রাতের ডিউটিতে। এদের প্রত্যেকের গল্প আছে, গন্তব্য আছে। বিশাল শহরটির কয়েক কোটি মানুষেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। এই বিশাল ক্যানভাসে দাঁড়িয়ে আমিও মনে মনে একটি গল্পের প্লট সাজাচ্ছিলাম, নিজের জীবনের গল্প। কবরে একাকী শুয়ে থাকা আমার প্রিয় বন্ধু ইউছুপ আলী ভাইয়ের জীবনেও এই শহর অনেক গল্প তৈরি করেছিলো। কিন্তু আজ সবই অতীত হয়ে গেছে।
রাত যত বাড়ছিল, হংকং ততই আলোকিত হচ্ছিল। চারদিকে শুধু আলো আর আলো। শহরের উঁচু উঁচু ভবনগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, মানুষ কত কিছু জয় করেছে! পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়েছে, পাহাড়ের বুকে তৈরি করেছে শত তলা উচ্চতার ভবন। সমুদ্রের বুক ঘেঁষে গড়ে উঠা এই হংকং নগরীতে শত শত আকাশ ছোঁয়া ভবন। ভৌগোলিক অবস্থান, প্রযুক্তি আর অর্থনীতির শক্তিতে গড়া সমৃদ্ধ পৃথিবীর অন্যতম এই ব্যস্ত নগরী। মানুষ কত কিছুই না এই নগরীতে করেছে, পাহাড় জয় করেছে, সাগর জয় করেছে, শুধু মৃত্যুকে জয় করতে পারেনি। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












