সংকটে জনজীবন এবং নানাপ্রসঙ্গ

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

২ সেপ্টেম্বর বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত আসনের মাননীয় সংসদ সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকারের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন, ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ স্থাপন ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপ সমূহ খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪২০০ কিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকায় অথবা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকুলে জরুরীভিত্তিতে নতুন ২১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবতা যাচাইয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আলোকে দেশের মানুষ কতটুকু আশান্বিত হতে পারে তা প্রশ্নই থেকেই যায়। এছাড়া এ সেক্টরের অদক্ষ, অনভিজ্ঞ জনবল নিয়ে এ মহাপরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে? বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার অর্থের জোগান দিতে হিমসিম খাচ্ছে সরকার সেখানে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার বিমান ক্রয়ের জন্য মার্কিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিলাসিতা চুক্তি কতটুকু যুক্তিসংগত?

শোষিত জনতার হাহাকার যদি প্রশাসনের শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে কম্পন সৃষ্টি করতে না পারে। তবে আমাদের দেশের এই হাফসিভিলাইজড অস্তিত্বের পরাজয় কোনদিনই ঘুচবে না। শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত মিহি স্বরে মেরুদণ্ড খোঁজার দিন কি এখনো শেষ হবে না! এবার সময় এসেছে শিরদাঁড়া টানটান করে প্রশ্ন করার।

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন এই বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে মিল রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনীর নির্দেশাবলী ২০০৬ অনুমোদন করা হয়েছে। যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। চলতি সপ্তাহে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়াবে বলে মনে করে সরকার। এর মাধ্যমে দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দশম থেকে ২০ তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এতে বেতনকাঠামোর ন্যায্যতা ও ভারসাম্য বাড়বে। নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হলেও সরকারের আর্থিকসক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ বিবেচনা করে ২০২৬২৭ ও ২০২৭২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানা গেছে।

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক চাপও রয়েছে। বেতন ভাতা, পেনশনসহ বিভিন্ন সুবিধার কারণে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকার বলছে, মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।

নতুন বেতন স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়াবে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো অর্থনীতিতে। এতে বেসরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির চাপ বাড়বে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এমনটাই ভাবছেন। সরকারি বেতন বৃদ্ধির প্রভাব সামলানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এমনিতেই বৈশ্বিক সংকটে শিল্প ও বাণিজ্যে এখন চরম অস্থিরতা। সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে যারা বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, তাদের কোনো নির্দিষ্ট বেতনকাঠামো নেই। চাকরির সুনির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী তারা কাজ করেন। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে এসব খাতের কর্মীদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির দাবি তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার বিষয়টি জড়িত।

সর্বদিক নাগরিক জীবনে এখন চরম সংকট বিরাজ করছে। দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকাগুলোতে রান্নার চুলা থেকে শুরু করে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, কলকারখানাসবখানে এখন তীব্র গ্যাসসংকট। আর এ সংকট স্থবির করে দিচ্ছে জাতীয় অর্থনীতির গতিকে। জীবনযাত্রাও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গরমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎও মিলছে না। বিশুদ্ধ পানির সংকটে দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, কলেরাসহ পানিবাহিত নানা রোগব্যাধি। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছেন। রাজধানী ঢাকা সহ প্রায় মহানগরে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট এবং পানির উৎস দূষণের কারণে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারি গুদামে বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ধানের মজুত থাকলেও কমছে না চালের দাম। মাছ, মাংস ও সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে ডিমে চাহিদা মেটাচ্ছেন। পণ্যের চড়া দামে ভোক্তাদের ক্ষোভ যেন থামছেই না।

প্রতিদিন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাজারের বেশি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদাসীনতা ও বর্তমান সরকারের নেওয়া টিকাদান কার্যক্রম ছোঁয়াচে এ রোগকে থামাতে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জুলাই ২০২৬ এর সর্বশেষ সার্ভিল্যান্স প্রতিবেদনেও ভয়াবহ এ তথ্য উঠে এসেছে। এ বছরের মে মাস পর্যন্ত বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ হামের সংক্রমণ ঘটেছে। মৃত্যুর হারেও শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগী বাড়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অতিবৃষ্টি, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ঘাটতি ও জনসচেতনতার সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। প্রতি মাসে এডিস মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়তে পারে। শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নয়, বর্তমানে প্রতিটি সেক্টরে সংকট থেমে নেই। প্রত্যেকটি সেক্টরে অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞ পরিকল্পনা প্রণয়নে অদূরদর্শিতা সংকটকে দিন দিন বাড়িয়েই দিচ্ছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনধারণের মাসিক বাজেট একেবারে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবন নির্বাহ করছেন।

আমাদের দেশে আইন আছে, পলিসি আছে, বিশাল বিশাল পদধারী কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশের বড় যে সমস্যা সেটি হলো আইনের প্রয়োগের সংকট। এই প্রয়োগটা সরকারি বেসরকারি দুই থেকেই জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আমাদের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা খুবই জরুরি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধব্যাংক নিয়ে অন্তহীন লুডুখেলা
পরবর্তী নিবন্ধসুব্রত বড়ুয়া ও তাঁর হলুদ বিকেলের গান