নিরাপদ পানির জন্য ওয়াসার নতুন মডেল

নগরীর দুই ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প । সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

নগরীর সুবিধাবঞ্চিত এবং পানি সরবরাহের আওতার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে সরকারিবেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) নতুন একটি পানি সরবরাহ মডেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। নগরীর ৪০ ও ৪১ নম্বর এই দুই ওয়ার্ডে চাহিদা নিরূপণ ও পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হবে। সফল হলে পর্যায়ক্রমে নগরীর অন্যান্য এলাকাতেও এ মডেল সমপ্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মধ্যে তিন বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। নগরীর যেসব এলাকায় ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক এখনো পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি, সেখানে কীভাবে টেকসই ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়মূলত তা পরীক্ষা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ও বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ইয়ানা ভ্যান ডার লিন্ডেনের উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ুবিষয়ক প্রথম সচিব ইঙ্গে ক্লাসেন স্বাক্ষরের সাক্ষী ছিলেন।

উদ্যোগটির প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে চলতি বছরের মে মাসে পরিচালিত একটি সমীক্ষায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ খাবার পানির সুযোগ সীমিত। এ দুটি ওয়ার্ডের মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক পৌঁছেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সমীক্ষায় দেখা যায়, এ দুটি ওয়ার্ডে বর্তমানে ৮৫ থেকে ১১৫টি বেসরকারি পানির ভেন্ডর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ বাসিন্দা এসব ভেন্ডরের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লিটার পানি কিনছেন। এ জন্য প্রতিদিন পরিবার প্রতি নগদ ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ নিরাপদ পানি পেতে নিম্নআয়ের মানুষের একটি বড় অংশকে নিয়মিত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি এলাকার পানির উৎস নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। সমীক্ষায় ওই এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে লবণাক্ততার মাত্রা ৬ হাজার পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া যায়, যেখানে জাতীয় নিরাপদ সীমা ১ হাজার পিপিএম। ফলে ভূগর্ভস্থ পানিকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগও পাচ্ছেন না বিপুল সংখ্যক মানুষ।

এ অবস্থায় ওয়াসার পাইপলাইন অবকাঠামো, সরকারি তত্ত্বাবধান এবং বেসরকারি খাতের পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাকে সমন্বয় করে নতুন মডেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানির চাহিদা, বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থা, ভোক্তার ব্যয় এবং অবকাঠামোগত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলা হবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার একা সবসময় প্রান্তিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে পারে না। মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে এনজিওগুলোর যোগাযোগ রয়েছে, বেসরকারি খাতের রয়েছে অভিজ্ঞতা, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং সরকারের রয়েছে নীতিগত সহায়তা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। এসব সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে নেওয়া পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে তা নগরীর অন্যান্য এলাকায় এবং পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য শহরেও সমপ্রসারণ করা যেতে পারে। পানি সরবরাহের পাশাপাশি নৌপথ, খাল ব্যবস্থাপনা ও বৃহত্তর পানিসম্পদ উন্নয়নেও বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ইয়ানা ভ্যান ডার লিন্ডেন বলেন, বাংলাদেশের পানি খাতে নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। এখন সেই সহযোগিতাকে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে সমন্বয় করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামে নেওয়া এ উদ্যোগ সেই নতুন অংশীদারিত্বের একটি উদাহরণ হতে পারে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, সরকারি তত্ত্বাবধানের সঙ্গে বেসরকারি খাতের উদ্ভাবন ও পরিচালন দক্ষতার সমন্বয়ের মাধ্যমে নগর পানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে নগরীর যেসব জনগোষ্ঠী এখনো নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের বাইরে রয়েছে, তাদের কাছে টেকসইভাবে পানি পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি হবে।

ম্যাঙ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম বলেন, সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। আর ম্যাঙ সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক জানান, বরিশাল ও খুলনায় বাস্তবায়িত পানি সরবরাহের কিছু অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত ‘বিল্ডিং ওয়াটার বিজনেস’ (বিডব্লিউবি) কর্মসূচির অভিজ্ঞতা। ওই কর্মসূচির আওতায় পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনায় ১০৫টির বেশি পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পেশাগতভাবে পরিচালিত এবং অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করা পানিসেবা বাংলাদেশে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব বলেও সভায় জানানো হয়।

চট্টগ্রামের নতুন মডেলটি চট্টগ্রাম ওয়াসার সরকারি অবকাঠামো ও বৃহৎ পরিসরে পানি সরবরাহের সক্ষমতার সঙ্গে বেসরকারি পরিচালন দক্ষতা যুক্ত করে কীভাবে একটি টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেটিই পরীক্ষার মূল বিষয়।

নগরীর দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার বিপরীতে পানি সরবরাহ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ওয়াসার পাইপলাইন পৌঁছাতে না পারায় পানি সংগ্রহে বাসিন্দাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পাইলট প্রকল্প নগরীর পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি একটি বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বেসরকারি বিনিয়োগ ও পরিচালন দক্ষতা কাজে লাগানোর মাধ্যমে নগরীতে পানি সরবরাহে এই মডেল সামনের দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরিশুদ্ধ জীবন গঠনে আউলিয়ায়ে কেরাম প্রদত্ত সিলসিলা অনুসরণ করতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬