বানরের খাবারের জন্য এক টাকা বরাদ্দও নেই

ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

দেশিবিদেশি পর্যটকদর্শনার্থীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় স্থান চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক ভ্রমণে গেলে বিশাল বিশাল বেষ্টনীতে দেখা মিলবে বাঘ, সিংহসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও পশুপাখির। এসব বন্য প্রাণী ও পশুপাখির জন্য সরকারিভাবে রেশনিং বা খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পার্ক কর্তৃপক্ষ এসব বন্য প্রাণী ও পশুপাখিকে নিয়ম করে খাবার সরবরাহ দিয়ে থাকে। সরবরাহকৃত সেই খাবার খেয়েই চলে যাচ্ছে এসব বন্য প্রাণী ও পশুপাখির জীবন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো পুরো পার্কজুড়ে কোলের সন্তানসন্ততি নিয়ে কয়েক হাজার বানরের আধিপত্য দেখা গেলেও তাদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ নেই এক টাকাও। এতে এসব বানর পুরোপুরি প্রাকৃতিক খাবার এবং পার্কে আগত পর্যটকদর্শনার্থীদের দেওয়া খাবারের ওপরই একমাত্র নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে।

সরজমিন দেখা গেছেপার্কে আগত দর্শনার্থী কোনো অভিভাবক বা তাদের শিশুদের হাতে কোন ধরনের খাবারের প্যাকেট দেখলেই ছুঁ মেরে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে বানরের দল। খাবার না দিলে অনেকসময় দর্শনার্থীদেরও আক্রমণ করতে দেখা যায় দলবদ্ধ বানরকে। এতে সিংহভাগ দর্শনার্থী দলবদ্ধ বানরের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্তও হয়ে পড়েন।

অবশ্য অনেক দর্শনার্থী ক্ষুধার রাজ্যে থাকা বানরের এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হাতের কাছে থাকা খাদ্যসামগ্রী মুহূর্তের মধ্যেই বিলিয়ে দিচ্ছেন। এতে উৎসুক অনেক দর্শনার্থী বানরকে খাবার খাওয়াতে পেরে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেও দেখা যায়। আবার অনেক পর্যটকদর্শনার্থী দলবদ্ধ বানরের এই আচরণে বেশ বিরক্তও প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে তারা পার্ক কর্তৃপক্ষ তথা সরকারকে পার্কে থাকা বানরের খাবারের যোগান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সম্প্রতি সরজমিন পার্ক এলাকা ঘুরে দেখা গেছেকঙবাজারের সংরক্ষিত চিরহরিৎ বনের প্রায় ৯০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক গড়ে তোলা হয়। পার্কের বিশাল এলাকাজুড়ে দেখা মেলে সন্তানসন্ততিসহ দলবদ্ধ এসব বানরের আধিপত্য। পুরো পার্ক এলাকায় তাদের বিচরণ থাকলেও ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই বেশিরভাগ বানর সন্তানসন্ততি নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায় পার্কে প্রবেশের প্রধান ফটকের ভেতর এবং বাইরের এলাকায়। কারণ পার্ক ভ্রমণ করতে আগত পর্যটকদর্শনার্থীদের উপস্থিতি এখানেই বেশি থাকে এবং তাদের হাতে নানা ধরণের খাবার থাকায় বানরগুলোও দিনের বেলায় বেশিরভাগ সময় এখানেই অবস্থান নেয় খাবারের আশায়।

সরজমিন আরও দেখা গেছেপার্কে আগত পর্যটকদর্শনার্থীরা পার্ক ভ্রমণের জন্য টিকিট সংগ্রহ করে থাকেন। সেই টিকিট বিক্রির ঘরের সামনের ফুটপাতে বিভিন্ন ফলমূলের খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। কোনো দর্শনার্থী সেই খাবার কিনে খেতে গেলেই সামনে হামলে পড়তে দেখা যায় বানরের দলকে। তখনই দর্শনার্থীরা খাবারের একটা অংশ বানরের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আবার কোনো কোনো দর্শনার্থী সরাসরি বানরের কাছে গিয়ে খাবার হাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন। আর সেই খাবার হাতে নিয়ে বানরের দল নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে মন ভরে খেয়ে নিচ্ছে। পুরো সাফারি পার্কে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই কাটছে সন্তানসন্ততিসহ বানরের জীবনযাপন। যা দেখে যে কোনো মানুষের মনে দাগ কাটবে।

পেকুয়া থেকে বন্ধুদের নিয়ে পার্ক ভ্রমণে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী গিয়াস উদ্দিন, টাঙ্গাইল থেকে আসা মো. সুমন মিয়া দৈনিক আজাদীকে বলেন, এই সাফারি পার্কে এসে নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম আমরা। কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে যখন আমরা খাওয়ার জন্য কিছু খাদ্যসামগ্রী কিনে হাতে নিলাম তখনই একদল বানর একেবারে কাছে এসে আমাদের কাছ থেকে সেই খাবার কেড়ে নিতে চাচ্ছে। তখনই বুঝতে পারলাম এসব বানর অভুক্ত। তাই তাদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য কেনা খাবারের অর্ধেকাংশ দিয়ে দেওয়ার পর দলবদ্ধ বানর মন ভরে খেয়ে নিল।

এসব দর্শনার্থী আরও বলেন, আবার খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম পার্ক কর্তৃপক্ষ এসব বানরকে খাবার সরবরাহ করে না, তাদের জন্য নাকি অন্যান্য প্রাণীর মতোই রেশনিং ব্যবস্থাও চালু নেই। যা শুধু দুঃখজনক নয় রীতিমতো অমানবিকও। তাই পার্কে আগত পর্যটকদর্শনার্থীদের আনন্দে মাতিয়ে রাখা কয়েক হাজার বানরের জন্য সরকারিভাবে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।

এই বিষয়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ বানরের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। ডিএফও দাবি করেন, আসলে কোথাও বানরের জন্য নির্দিষ্ট করে খাবারের ব্যবস্থা বা রেশনিং চালু করা নেই। মূলত এসব বানর পুরোপুরি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ফলমূল, লতাগুল্ম খেয়েই বড় হয়ে থাকে। এজন্য পার্ক কর্তৃপক্ষ পার্কের বিভিন্ন স্থানে বানরের খাবারের জন্য প্রাকৃতিকভাবে ফলমূলের গাছপালা, লতাগুল্মের আবাদ করে দিয়েছে। সেই খাবারই তাদের জন্য একমাত্র উপযুক্ত খাবার। অবশ্য পার্কে খাবার নিয়ে কোনো পর্যটকদর্শনার্থীর প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও কেউ কেউ অগোচরে খাবার নিয়ে পার্কের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ায় বানরও সেই সুযোগ নিয়ে থাকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধআকবরশাহ এলাকায় চুরির ঘটনায় চোর চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার