মহান রবিউল আউয়াল মাস চলমান। স্বভাবতই আল্লাহর রসূল (স.)-এর শানে লিখতে মন থেকে তাড়িত হওয়া স্বাভাবিক। আহলে বায়েত অর্থাৎ আল্লাহর রসূল (স.)-এর পরিবার। এটি আল্লাহর রসূল (স.)-এর পরিবারের সদস্যদের নির্দেশ করে। আহলে বায়েতের পরিধি নিয়ে স্কলারদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। পবিত্র কোরআন মাজীদের বিভিন্ন তাফসীরের আলোকে আল্লাহর রসূল (স.)-এর মহান স্ত্রীগণ আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে রক্তের সম্পর্কের পরিবার হযরত আলী (ক.), হযরত ফাতেমা (র.), ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (র.)-কেও আহলে বায়েতের মূল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অনেক বিশ্লেষক তাদের সন্তান–সন্ততি ও বংশদেরকেও উল্লেখ করে গেছেন। কোন কোন হাদীস শরীফের বিশ্লেষণে হযরত আলী, হযরত আকিল, হযরত জাফর ও হযরত আব্বাস (র.)-এবং তাদের পরিবার ও বংশধরগণকে আহলে বায়েতের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
আহলে বায়েতের পরিধি নিয়ে রয়েছে একাধিক মত বিশ্লেষণ। আহলে বায়েত বলতে আল্লাহর রসূল (স.)-এর পরিবারকে বুঝানো হয়েছে। এতে প্রধানত হযরত আলী (ক.), হযরত ফাতেমা (র.), ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (র.)-এই চারজনের সাথে উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ অন্তর্ভুক্ত বলে অনেক বিশ্লেষক উল্লেখ করে গেছেন।
মহান আল্লাহপাক আল্লাহর রসূল (স.)-এর আহলে বায়েতের বহুবিধ মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন। তাদেরকে ভালবাসার আবশ্যকতা এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত ঐকমত্য পোষণ করে।
মহান আল্লাহপাক বলেন: “হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা তো অন্য কোন নারীর মত নও। (অতএব) তোমরা যদি মুত্তাকী হয়ে থাকো, তাহলে (অন্য লোকের সাথে) নরম করে কথা বলবে না; তাতে অন্তরে ব্যাধিগ্রস্ত কোনো (পুরুষ) লোক প্রলুব্ধ হতে পারে; তবে স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে। তোমরা তোমাদের ঘরে থাকবে এবং আগের অজ্ঞতাযুগের মতো নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে এবং আল্লাহ ও তার রসূলের কথা মেনে চলবে। হে নবী পরিবারের লোকেরা! আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে পঙ্কিলতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পুরোপুরি পবিত্র করতে।” [সূরা আহযাব: ৩২–৩৩]
হযরত আয়েশা (র.) বলেন, ‘আল্লাহর রসূল (স.) এক সকালে বের হলেন। তাঁর গায়ে ছিল কালো পশমের ডোরাকাটা চাদর। তখন ইমাম হাসান ইবনে আলী (র.) এলেন, তিনি তাকে চাদরের ভিতর প্রবেশ করিয়ে নিলেন। এরপর ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (র.) এলে তিনিও চাদরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লেন। এরপর হযরত ফাতেমা (র.) এলে, তাকেও ভিতরে ঢুকিয়ে ফেললেন। এরপর আলী (ক.) এলে তাকেও ভিতরে ঢুকিয়ে নিলেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (স.) বললেন, হে আহলে বায়েত! আল্লাহতাআলা তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করে তোমাদের পুরোপুরি পবিত্র করতে চান।’ (সহীহ মুসলিম)- মহান আল্লাহ পাক বলেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়ে অগ্রগণ্য এবং তাঁর সহধর্মীগণ তাদের মা সমতুল্য।” (সূরা আহযাব)- হযরত ওয়ালেহা ইবনুল আসকা (র.) বলেন, “আমি আল্লাহর রসূল (স.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)-এর বংশ থেকে কিনানা গোত্রকে বেছে নিয়েছেন। কিনানা গোত্র থেকে কুরাইশ বংশকে বেছে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে হাশেম উপগোত্রকে বেছে নিয়েছেন এবং হাশেমী বংশধর থেকে আমাকে বেছে নিয়েছেন।‘” (সহীহ মুসলিম)- হযরত জায়েদ ইবনে আরকাম (র.) বলেন, “আল্লাহর রসূল (স.) একদিন (পবিত্র) মক্কা ও (পবিত্র) মদিনার মাঝামাঝি খোম জলাশয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে বক্তৃতা দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও উপদেশ শেষে নসীহত করলেন। তারপর বললেন, ‘হুঁশিয়ার হে লোকসকল! আমি একজন মানুষ, অতিসত্তর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা (মৃত্যুদূত) আসবে, আর আমিও তার আহ্বানে সাড়া দিব।‘
আমি তোমাদের মাঝে ভারী দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হল আল্লাহর কিতাব। এতে হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা আছে। অতএব তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অনুসরণ কর, একে শক্ত করে আঁকড়ে রাখ। তারপর তিনি কোরআনের প্রতি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর বলেন, আর দ্বিতীয়টি হল আমার আহলে বায়েত। আর আমি আহলে বায়েতের বিষয়ে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করে দিচ্ছি। আহলে বায়েতের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আহলে বায়েতের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি।” (সহীহ মুসলিম)
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (র.) বলেন, “যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, আমার কাছে নিজের আত্মীয়তা রক্ষার চেয়ে আল্লাহর রসূল (স.)-এর আত্মীয়তা রক্ষা করা অধিক পছন্দনীয়।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
হযরত হাফেজ ইবনে হাজার (র.) বলেন, “‘আল্লাহর রসূল (স.)-এর আহলে বায়েতের দেখভাল কর।‘ এ কথার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করা হচ্ছে এবং তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। কোন কিছুকে দেখার অর্থ যে জিনিসের সংরক্ষণ করা। অর্থাৎ তিনি বলেছেন তাদের দেখে রাখার মাধ্যমে তাদের অধিকার সংরক্ষণ কর। তাদেরকে কষ্ট দিও না এবং তাদের সাথে মন্দ আচরণ করো না।” (ফাতহুল বারী)
আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর (র.)-এর আমলে আহলে বায়েতের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতেন। তৎমধ্যে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদেরকে নিজের উপর এবং অন্যান্য মানুষের উপর প্রাধান্য দিতেন। আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর (র.) অনুরূপভাবে যখন রাজস্ব বিভাগ প্রবর্তন করলেন, তখন মানুষের বংশ মর্যাদা অনুসারে তাদের নাম লিখলেন, আল্লাহর রসূল (স.)-এর নিকট আত্মীয়দের দিয়ে তিনি নাম শুরু করতেন। অতঃপর আরবদের নাম লিখতেন। অতঃপর অনারবদের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেন। পরবর্তীতে খলিফাগণের যুগেও এমনটি ছিল। অতঃপর উমাইয়া খলিফা ও আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে তা বহাল ছিল। পরবর্তীতে তা বদলে যায়।
উম্মতে মুহাম্মদীকে অবশ্যই বুঝতে হবে–আল্লাহর রসূল (স.)-এর সঙ্গে যার যত নিকটতম সম্পর্ক, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তত পরিমাণ জরুরী ও আবশ্যক। মানুষ স্বভাবতই স্ত্রী ও সন্তানদের ভালবাসে। তাই যখন আল্লাহর রসূল (স.)-কে নিজের জান, মাল, সন্তান–সন্ততি সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে, তখন তাঁর পরিবার, সন্তান তথা আহলে বায়েতকে ভালবাসার জন্য আমাদের প্রতি ওই নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।
হযরত ইবনে আব্বাস (র.)-এর অভিযোগের ভিত্তিতে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে আল্লাহর রসূল (স.) বলেছেন, “কসম ওই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ! কোন ব্যক্তির অন্তরে ঈমান প্রবেশ করবে না, যদি না তারা আল্লাহ ও রসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তোমাদের আহলে বায়েতকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে।” (সহীহ তিরমিজি)
আল্লাহর রসূল (স.) বলেন, “তোমরা আল্লাহর সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক রাখ, কেননা আল্লাহই তোমাদের রিজিক দেন এবং তোমাদের লালনপালন করেন। আর আল্লাহর মহব্বতের ভিত্তিতে আমার সাথে ভালবাসার সম্পর্ক রাখ এবং আমার মহব্বতের কারণে আমার আহলে বায়েতের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক রাখ।” (সহীহ তিরমিজি)
আহলে বায়েতের প্রতি ভালবাসা ও মহানুভবতা প্রদর্শনের ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে কোন মতভেদ থাকতে পারে না। উম্মতের ঐকমত্যে আল্লাহর রসূল (স.)-এর সাথে সাথে আহলে বায়েতের প্রতি শ্রদ্ধা ও মহব্বত রাখা জরুরি। অতএব উম্মতে মুহাম্মদীর দায়িত্ব হবে আহলে বায়েতের প্রতি মনের গভীর থেকে মহব্বতের সাথে শ্রদ্ধা রাখা।
লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।












