হাটহাজারীতে টেক্সি ওয়ার্কশপের আড়ালে অস্ত্রের কারখানা

ক্রেতা সেজে চক্রের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ । নজর কেড়েছে ছোট পেনগান, উদ্বেগ । এছাড়া পিস্তল গুলি ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

হাটহাজারী প্রতিনিধি | বুধবার , ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

সামনে সিএনজি টেঙি মেরামতের ওয়ার্কশপ। বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি সাধারণ ওয়ার্কশপের মতো। ভেতরে চলছিল ভিন্ন কারবার। টেক্সি মেরামতের আড়ালে সেখানে তৈরি হচ্ছিল দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র। তৈরি করা এসব অস্ত্র পৌঁছে যাচ্ছিল বিভিন্ন ব্যক্তি ও অপরাধী চক্রের হাতে। অবশেষে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারিতে বেরিয়ে এসেছে হাটহাজারীর সরকারহাট বাজারের এই গোপন অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান। গত সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে মির্জাপুর ইউনিয়নের মনসুরাবাদ কলোনি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র সরবরাহকারী চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে হাটহাজারী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি অত্যাধুনিক দেশীয় পেনগান, চারটি দেশীয় পিস্তল এবং ২০ রাউন্ড গুলি। একই সঙ্গে সরকারহাট বাজারে ওসমানের সিএনজি অটোরিকশা ওয়ার্কশপ থেকে অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত দুজন হলেন মো. জামাল হোসেন ওরফে জামাল মিস্ত্রি (৪৪) ও মো. কবির (৪৭)

পুলিশ বলছে, তারা অস্ত্র তৈরি, সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সদস্য। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্র তৈরির মূল আস্তানাটির সন্ধান মেলে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানায়, হাটহাজারীতে দেশীয় অস্ত্র তৈরি ও সরবরাহকারী একটি চক্র সক্রিয় রয়েছেএমন তথ্য পাওয়ার পর থেকে পুলিশ চক্রটির ওপর নজরদারি শুরু করে। তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য অস্ত্র ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। একপর্যায়ে অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে জড়িত জামাল ও কবিরের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পেয়ে অভিযান চালানো হয়।

জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের দিকনির্দেশনায় হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের নেতৃত্বে এসআই ফখরুল ইসলাম, এসআই আশিকুর রহমান ও এসআই নাজমুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে।

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় জামাল ও কবির। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের সরকারহাট বাজারের উত্তর পাশে থাকা ওসমানের সিএনজি টেঙি ওয়ার্কশপটি ছিল অস্ত্র তৈরির আড়ত। বাইরে থেকে সাধারণ ওয়ার্কশপ হিসেবে পরিচালিত হলেও এর আড়ালে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করা হতো। পরে এসব অস্ত্র বিভিন্ন জায়গায় বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হতো।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়ার্কশপের মালিক দেশের বাইরে থাকেন। তার অনুপস্থিতিতে ওসমান নামের একজন ওই ওয়ার্কশপ পরিচালনা করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্কশপের আড়ালে ওসমান অস্ত্র তৈরির কাজ করতেন। তৈরি করা অস্ত্র পরে জামাল ও কবিরের মাধ্যমে বিক্রি ও সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে ওসমান পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানিয়েছেন, পুলিশ অস্ত্রের ক্রেতা সেজে চক্রটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। প্রাথমিকভাবে অস্ত্র বিক্রির জন্য ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। পরে যথাযথ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযানের পর সরকারহাট বাজারের ওই ওয়ার্কশপে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আলামত উদ্ধার করা হয়। এসব সরঞ্জাম পরীক্ষানিরীক্ষা করে সেখানে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র তৈরি করা হতো, কতদিন ধরে এ কার্যক্রম চলছিল এবং উৎপাদিত অস্ত্র কোথায় কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

পুলিশের উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে পেনগান। আকারে ছোট এবং সাধারণ কোনো কলম বা ছোট সামগ্রীর মতো বহন করা সম্ভব হওয়ায় এ ধরনের অস্ত্র সহজে লুকিয়ে রাখা যায়। ফলে অপরাধীদের হাতে এ ধরনের অস্ত্রের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুই আসামির বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম পরীক্ষা করে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পলাতক ওসমান এবং এ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানিয়েছেন, অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করে তা নির্মূল এবং অস্ত্র সরবরাহকারী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় মিনিট্রাক চাপায় প্রাণ গেল দুই বন্ধুর
পরবর্তী নিবন্ধবন্দরে এবার বিলাসবহুল চারটি গাড়ি ও যন্ত্রাংশের দুটি চালান আটক