ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে শুরু হওয়া এ অধিবেশনে বিরোধী দলের এক সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ঘিরে প্রায় ১৪ মিনিট ধরে বাদানুবাদ ও হৈচৈ হয়। এক পর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকলে কয়েক দফা তাদের বসতে বলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার একটি বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা বললেও প্রতিবাদ চলতে থাকে।
বাদানুবাদের পর প্রশ্নোত্তর শেষ হলেও বিষয়টি সেখানেই থামেনি। পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে আরেক সদস্যের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সংসদের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্পিকার। তিনি বলেন, বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে একে অন্যকে বাধা দিচ্ছেন, তা ভালো লক্ষণ নয়। সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত। খবর বিডিনিউজের।
এদিন বিকাল ৩টায় স্পিকারের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানান স্পিকার। শোকপ্রস্তাব গ্রহণের পর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর।
আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি নিয়ে কুমিল্লা–৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটা প্রশ্ন হল, না পল্টনের বক্তৃতা হল, বুঝতে পারিনি। এরপর পটুয়াখালী–২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, দিনে–দুপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই হচ্ছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। সরকারি দলের আইনুল হক ও এস এম জাহাঙ্গীর এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তোলেন এমপি মাসুদ। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় গেলে তাকে ঘিরেও ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেওয়া হচ্ছে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা–ভুয়া মামলা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন জামায়াতে ইসলামীর এ এমপি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমে বলেন, তিনি প্রশ্নের প্রথম অংশ শুনতে পাননি। এরপর শফিকুল ইসলাম মাসুদকে আবার প্রশ্নটি বলতে বলা হয়। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন শোনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না। এ বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানাতে থাকেন। অনেকেই আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে বলি নাই।’ তাতেও হইচই থামেনি। এক পর্যায়ে স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার আমি আপনার শেল্টার চাচ্ছি।’
তখন স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার জন্য তাদের অনুরোধ জানান। এরপর হৈচৈ বেড়ে গেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ইয়েস আই উথড্র, আই উথড্র, আই উথড্র, ঠিক আছে?” এরপরও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ চালিয়ে গেলে একপর্যায়ে নিজের আসনে বসে পড়েন সালাহউদ্দিন আহমদ। বিরোধী দল প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন স্পিকার। তিনি বলেন, মাননীয় বিরোধীদলীয় সদস্যবৃন্দ আপনারা অনুগ্রহ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনবেন।
হইচই চলতে থাকলে স্পিকার বারবার সদস্যদের বসার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, মাননীয় সদস্যবৃন্দ অপেক্ষা করুন, এক মিনিট। বসুন বসুন। জাস্ট হোল্ড অন, প্লিজ আমার কথা শুনুন, লিসেন টু মি। মাননীয় সদস্যবৃন্দ হয়েছে তো অনেকক্ষণ বলেছেন এখন আপনারা অনুগ্রহ করে বসুন। অনুগ্রহ করে নিজের আসনে বসুন। আরও বলেন, অনুগ্রহ করে নিজ নিজ আসনে বসুন। কথা বলার তো অনেক সুযোগ আপনাদেরকে দিচ্ছি। এইভাবে ঢালাও না বলে মাইকে বললে তো সবাই শুনতে পায়। আপনাদেরকে সুযোগ দেওয়া হবে। যখন সুযোগ পাবেন, মাইকে বলবেন। একপর্যায়ে স্পিকার বলেন, এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছা মতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন। তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার আহ্বান জানান।
স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য শেষ করলে বিরোধীদলীয় নেতাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। বিরোধীদলীয় নেতা দাঁড়ানোর পরও পেছনের সারির কয়েকজন সদস্য কথা বলতে থাকলে তাদেরও বসতে বলেন তিনি। সে সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
স্পিকার বলেন, আপনাদের নেতারা কী বলেন, সেটা শোনার চেষ্টা করবেন। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। প্রচুর সুযোগ আছে আপনাদের জন্য এই সংসদে বক্তব্য দেওয়ার।
হইচইয়ের মধ্যেই আবার বক্তব্য শুরু করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তখন স্পিকার তাকে বিরোধী দলের দিকে না তাকিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দিতে বলেন। স্পিকার বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো আপনার দিকেই তাকিয়ে কথা বলছি।’
বিরোধী দলের সদস্যরা তখনও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছিলেন। স্পিকার তখন বলেন, আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধী দলের নেতাকে দেব।
এরপর সালাহউদ্দিন আহমদ শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, কোথায় ছিনতাই হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হয় নাই সেটার স্পেসিফিক বর্ণনা দরকার। শুধু হাওয়াইভাবে যদি বলা হয়, আমভাবে যদি বলা হয় যে এই সমস্ত হচ্ছে প্রতিকার কি, বিরোধী এমপির ওপর হামলা হচ্ছে প্রতিকার কি, স্পেসিফিক কোশ্চেন করতে হবে। সেজন্য বলছি এটা মহান জাতীয় সংসদ।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে কথা বলার সুযোগ দেন স্পিকার। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, আমাকে আগে সুযোগ দিলে উনার কথাটা শুনতে পেতাম। এ সময় সরকারি দলের কয়েকজন সদস্যও কিছু বলতে থাকলে শফিকুর রহমান তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘বক্তব্য কি আপনি দেবেন না আমি দেব? আপনি দেন।’ এ সময় সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বাদানুবাদ হতে দেখা যায়।
এরপর স্পিকারকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এটা অশোভন। আমার বক্তব্যের সময় যদি এইভাবে কমেন্টস করা হয়, তাহলে আমার এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। স্পিকার তাকে বক্তব্য চালিয়ে যেতে বলেন। এরপর শফিকুর রহমান বলেন, আমি সম্মানিত সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, আজকে নতুন করে তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন নাই। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তিনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সবাইকে। উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে, সম্মতি সূচক শব্দ উচ্চারণ করে সমর্থন দেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এমনকি তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সেই দুঃসাহস এখানে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে, এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন, ওখানে যার পছন্দ গিয়ে ভর্তি হবে, উনার লেকচার শুনবে। শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, আজকে একই বক্তব্যে দুইবার তিনি অ্যাটাক করে ফেললেন। আমার সঙ্গীরা তো মনে করেন, আমি নিজেও মনে করি যে এইটা কালচারাল না, এইটা পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম। এটা হওয়া উচিত না। এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুঃখ প্রকাশের দাবি জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তার বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দিতে হবে। তা করা হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে থাকবে। অন্যথায় অপমান নিয়ে সংসদে বসার প্রশ্ন ওঠে না। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তার বক্তব্যে সমর্থন জানান।
এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদ জনগণের আশা আকাক্সক্ষা প্রতিফলন করার জন্য সবাই আমরা দায়িত্ব পালন করছি। সংসদ দেশের গর্ব জনগণের প্রতিষ্ঠান হাউস অফ দি পিপল। এই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় কিছু আইন কানুন রীতি নীতি অনুসারে। বিশেষ করে রুলস অফ প্রসিডিউর যদি ফলো করা না হয়, তাহলে সংসদ কার্যকর থাকে না। স্পিকার বলেন, কিছু কিছু সদস্যের মধ্যে অসহিষ্ণুতা লক্ষ্য করছেন। তিনি বলেন, সরকারের নানা ত্রুটি–বিচ্যুতি সম্পর্কে আপনারা বক্তব্য রাখছেন, আরো ভবিষ্যতে রাখতে পারবেন। কিন্তু একজন মন্ত্রীকে তো তার বক্তব্য শেষ করতে দিতে হবে।








