মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্পট মার্কেট থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ১০–১২ ডলারে কিনত। ছয় মাসের মাথায় এখন সেই একই স্পট এলএনজির জন্য দিতে হচ্ছে ২৪ ডলারের বেশি। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরের দুটি কার্গোর একটি কেনা হচ্ছে ২৪ দশমিক ৬২৫ ডলার এবং অন্যটি ২৪ দশমিক ২৫ ডলার দরে। ফলে এলএনজি আমদানির ব্যয়ই কেবল বাড়ছে না, তা এখন দেশের জ্বালানি খাতের ওপর বাড়তি হাজার কোটি টাকার চাপ তৈরি করছে। একইসাথে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব ফেলবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
গত সোমবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো ইন্টারন্যাশনাল একটি কার্গো সরবরাহ করবে ১৩–১৪ সেপ্টেম্বর, দাম পড়বে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ দশমিক ৬২৫ ডলার। আর টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে ২৩–২৪ সেপ্টেম্বরের জন্য আরেকটি কার্গো কেনা হবে ২৪ দশমিক ২৫ ডলারে।
বাংলাদেশে সাধারণত একটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। সেই হিসাবে ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ইউনিট ধরে হিসাব করলে ২৪ দশমিক ২৫ ডলারের একটি কার্গোর পণ্যমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। বর্তমান ১২৫ টাকা ডলার ধরলে এর মূল্য প্রায় ৯৭০ কোটি টাকা। ২৪ দশমিক ৬২৫ ডলারে একই পরিমাণ কার্গোর মূল্য প্রায় ৭৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকা। দুটি কার্গোতে শুধু এলএনজির পণ্যমূল্য প্রায় ১ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। কার্গোতে ৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ইউনিট থাকলে ব্যয় আরো বাড়বে।
অথচ যুদ্ধের আগে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ছিল ১০–১২ ডলার। অর্থাৎ বর্তমানে ২৪ দশমিক ২৫–২৪ দশমিক ৬২৫ ডলারের দাম আগের ১০ ডলারের তুলনায় প্রায় ১৪০–১৪৬ শতাংশ এবং ১২ ডলারের তুলনায় প্রায় ১০০–১০৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। ১২ ডলারকে যুদ্ধ–পূর্ব গড় দাম ধরে ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন এমএমবিটিইউর একটি কার্গো হিসেব করলে ২৪ দশমিক ২৫ ডলারের কার্গোতে অতিরিক্ত খরচ প্রায় ৩৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা। একই হিসাবে ২৪ দশমিক ৬২৫ ডলারের কার্গোতে বাড়তি ব্যয় প্রায় ৪০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বা ৫৫০ কোটি টাকা। শুধু আগামী সেপ্টেম্বর মাসের জন্য আমদানিকৃত দুটি কার্গোতে যুদ্ধ–পূর্ব ১২ ডলারের দামের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। আগের ১০ ডলারে কেনা হিসেব ধরলে বাড়তি ব্যয়ের পরিমান ১২শ কোটি টাকার বেশি।
সূত্র বলেছে, যুদ্ধের পর কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর কাতারের রাস লাফান থেকে বাংলাদেশ কোনো এলএনজি কার্গো পায়নি। ঘাটতি সামাল দিতে মার্চ থেকে ৩৫টি স্পট কার্গো নেওয়া হয়েছে। আর এই খাতে বাড়তি খরচ হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
এর ফলে সরকারের ভর্তুকির চাপও দ্রুত বেড়েছে। এপ্রিলে শুধু এলএনজি আমদানিতে পেট্রোবাংলার ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ওই ঘাটতি মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি চাওয়া হয়েছিল। একই সময়ে মে মাসের জন্য আরো ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকির আবেদন করা হয়।
গত মার্চ ও এপ্রিল মাসের জন্য এলএনজি আমদানির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি বাড়াতে হয়েছিল বলে সূত্র জানিয়েছে। পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, এপ্রিল–জুন তিন মাসে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির প্রয়োজন হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ৪ হাজার কোটির বেশি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে এলএনজি আমদানিতে।
চলতি আগস্টেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। পেট্রোবাংলা আগস্টে মোট নয়টি কার্গো আনার প্রস্তুতি নিয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ২৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ। এর মধ্যে তিনটি স্পট মার্কেট থেকে, পাঁচটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসার কথা। গত মাসে ১১টি কার্গোতে মোট ৩৫ দশমিক ২ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ এলএনজি আনা হয়েছিল।
আগস্টে সর্বশেষ আসা বিপি সিঙ্গাপুরের একটি কার্গোর এলএনজি কেনা হয়েছে ২১ দশমিক ৮৭৮ ডলারে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বরের যে কার্গোটি চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে সেটি কেনা হয়েছে ২১ দশমিক ৭৭৮ ডলারে। প্রতিটি কার্গোই আনতে হচ্ছে চড়া দামে, যুদ্ধ শুরুর আগের দ্বিগুণের বেশি দামে।
বাংলাদেশের সংকট উভয়মুখী বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে, অন্যদিকে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে বেশি দামে স্পট কার্গো কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয়, টার্মিনাল ও রিগ্যাসিফিকেশন ব্যয়। চড়া দামে আমদানিকৃত এলএনজি স্থানীয়ভাবে ভর্তুকি দিয়ে কম দামে গ্যাস বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে পেট্রোবাংলার আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, কাতার ২০২৬ সালে ৪০টি কার্গোর মধ্যে মাত্র ২০টি সরবরাহ দিতে পেরেছে। বাকি গ্যাসের চাহিদা চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে।
এলএনজি টার্মিনালের সংকটও পরিস্থিতি আরো জটিল করেছে। মহেশখালীর এঙিলারেট এনার্জির টার্মিনালে ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও স্বাভাবিক সরবরাহে ফিরতে সময় লেগেছে।
যুদ্ধ–পূর্ব ১০–১২ ডলারের এলএনজি যদি সামনের দিনগুলোতে ২৪ ডলারের বেশি দরে কিনতে হয়, তাহলে প্রতি ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন এমএমবিটিইউর একটি কার্গোতেই প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় হবে। মাসে চারটি কার্গো আনতে হলে এই বাড়তি ব্যয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ফলে এলএনজি আমদানির বিদ্যমান পরিস্থিতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সরকারি ভর্তুকি, পেট্রোবাংলার আর্থিক সক্ষমতা এবং শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।










