তারা ভরা রাতে তোমার কথা মনে পড়ে

রোকন উদ্দীন আহমদ | সোমবার , ২৪ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার বাংলা গানের ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। বাংলাভাষার এক মোহিনীশক্তির কণ্ঠশিল্পী। পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেও বাঙালির হৃদয়ে তাঁর কণ্ঠ জাগ্রত। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে তাঁর কণ্ঠ যুগ যুগ থাকবে সজীব। “সালাম সালাম হাজার সালাম” “জয় বাংলা বাংলার জয়”, “ওরে নীল দরিয়া”, “তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়”এরকম প্রাণছোঁয়া গান তাঁকে বাঙালির হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে।

আবদুল জব্বারের জন্ম বাউলবৈষ্ণবের জেলা কুষ্টিয়ায়। ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর এই ক্ষণজন্মা বাঙালি জন্মগ্রহণ করেন। লালন ফকিরের স্মৃতিভূমির উদার প্রকৃতিতে বেড়ে উঠেন। এ কারণে তিনি জনগণের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। গণআন্দোলন শাণিত করতে তিনি রাজপথে গান গেয়েছেন। ১৯৬৯ সালে তিনি “বিমূর্ত” নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গড়ে তোলেন বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী। এই শিল্পীগোষ্ঠীর সভানেত্রী ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এই সময়ে আবদুল জব্বার জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পী ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন। ১৯৬৪ সালে উর্দু চলচ্চিত্র সঙ্গমে প্লেব্যাক করে সবার নজর কাড়েন। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের আরো প্রস্তাব পান।

আবদুল জব্বার ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। ১৯৭১ সালে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠ সৈনিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছেন। বঙ্গন্ধুর স্নেহধন্য ছিলেন এই তরুণ শিল্পী। ২৫ মার্চেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালির উপর ভয়ালতম গণহত্যার পর তিনি ঢাকা থেকে কলকাতায় গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম গান তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে দেশত্ববোধক গানে মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ সঞ্চার হয়। তাঁর উদার কণ্ঠে তখন ভেসে আসতসালাম সালাম হাজার সালামসকল শহীদ স্মরণে, অনেক রক্ত দিয়েছি মোরা, আমি এক বাংলার মুক্তিসেনা, জয় বাংলা বাংলার জয়, সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম মুজিবর, আমার দেশের মান দেব না প্রাণ থাকিতে, এসব গান। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে উদ্বুদ্ধ করল তাঁর আরো একটি গান, “মুজিব বাইয়া যাওরেনির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাওরে মাঝি”। তখন জীবন বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধারা ছোট্ট রেডিওতে এসব গান শুনে অন্তরে গেঁথে নিতেন স্বাধীনতার মন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাসে তাঁর গানগুলো স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্ব হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে যেসব কণ্ঠযোদ্ধা অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন আবদুল জব্বার তাঁদের অন্যতম। তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধে গান গাওয়া তাঁর সঙ্গীত জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে পিতৃতুল্য মনে করে সম্বোধন করতেন ‘বাবা’। তাঁকে দেখলেই বঙ্গবন্ধু বুকে জড়িয়ে নিতেন।

আবদুল জব্বারের কণ্ঠে চলচ্চিত্রের গানগুলো বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। “এতটুকু আশা” ছবিতে “তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়” গানটি স্থায়ী হয়ে আছে দর্শক শ্রোতার হৃদয়ে। সত্য সাহার সুরে তাঁর দরদী কণ্ঠে গানটি মানুষের প্রাণ ছুঁয়েছিল। আবদুল জব্বারের নাম বললে সর্বপ্রথম মনের আয়নায় ভেসে ওঠে “ওরে নীল দরিয়া” গানটি। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস “সারেং বউ” অবলম্বনে “সারেং বউ” চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। এই চলচ্চিত্রে দেখা যায়, একজন প্রবাসী কদম সারেং বহুদিন পর ফিরছে জন্মভিটায়। ফিরছে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে। অমর এই চলচ্চিত্রটিতে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের মধ্যে একজন প্রবাসী নাবিকের তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য প্রেম ও জন্মভূমির জন্য আকুলতা ফুটে ওঠে। আবদুল জব্বার নিজে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই গানটি সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। এই গানে তাঁর শিল্পী সত্তার পূর্ণ সার্থকতা পাওয়া যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে ‘মানুষের মন’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, ঝড়ের পাখি, আলোর মিছিল, সূর্যগ্রহণ, তুফান, অঙ্গার, সারেং বউ, সখি তুমি কার, কলমিলতা সিনেমায় আবুদল জব্বারের গাওয়া গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭৮ সালের ‘সারেং বউ’ সিনেমার ওরে নীল দরিয়া গানটি তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়।

বাংলাদেশে আধুনিক গানের একটি স্বর্ণযুগ ছিল। সেই স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ ছিলেন আবদুল জব্বার। আধুনিক গানের রোমান্টিক ও বিরহের ধারার তিনি ছিলেন প্রধান পুরুষ। ১৯৪৭ পরবর্তী ঢাকা বেতার কেন্দ্রে আনিসুল হক চৌধুরী, . আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কলকাতা থেকে আসা কবি আজিজুর রহমান যুক্ত হলেন গান রচনায়। এসময় যারা গান কণ্ঠে তুলতেন তাঁরা হলেনআনোয়ার উদ্দিন খান, ফেরদৌসী রহমান, ইসমত আরা, লায়লা আরজুমান্দ বানু, আনজুমান আরা বেগম প্রমুখ। রাজশাহী ও রংপুর বেতার প্রতিষ্ঠিত হলে বেতার কর্মকর্তা নাজমুল আলম কুষ্টিয়া সফরে যান। সেখানে এক অনুষ্ঠানে আবিষ্কার করেন বিড়ি শ্রমিক সুকণ্ঠ আবদুল জব্বারকে। নাজমুল আলমের আগ্রহে আবদুল জব্বার ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসাবে সুযোগ পান। এসময় পাকিস্তানি বাঙালি শিল্পী নাহিদ নিয়াজির ‘আকাশের ওই মিটি মিটি তারার সাথে কইব কথা’ হাসিনা মুমতাজের ‘তন্দ্রাহারা নয়ন আমার, আনজুমান আরা বেগমের গাওয়া ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ এই গানগুলো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। গানগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ চলচ্চিত্রে আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ, কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি জনপ্রিয়তায় সকল শিল্পীর রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। এসময় আধুনিক গানের স্রোতে যুক্ত হলেন শক্তিশালী মেলোডি কণ্ঠ সৈয়দ আবদুল হাদি, কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী, খোন্দকার ফারুক আহমদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, বশির আহমদ, আবদুল রউফ ও এমএ হামিদ। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আবদুল জব্বার ঢাকায় চলচ্চিত্র ও বেতারে কণ্ঠ দিয়ে চললেন। তাঁর কণ্ঠে সৃষ্টি হলো তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়এই অমর গানটি। আবদুল জব্বারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি গাইলেন আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন, একবুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও, আমার এই চোখ দুটি আয়না করে তোমার ছবিটি যদি দেখতে, ভাবনা আমার আহত পাখির মতো, মনরে ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়, আমার আকাশে আজ মেঘ করেছে, ভালোবাসা যন্ত্রণা হয়, আমার সে প্রেম আমাকে ফিরিয়ে, ওগো তন্নী তরুলতা বহ্নি আঁখি বলনা তোমায় আমি কি নামে ডাকি, ইত্যাদি গান। এসব গান তাঁকে অমর করে রাখবে। আবদুল জব্বারের গাওয়া তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়, ওরে নীল দরিয়া এবং সালাম সালাম হাজার সালামসহ তার প্রায় সব গান আন্তর্জাতিক মানের।

আবদুল জব্বারের গান থেকে আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। তিনি চলে গেলেও তাঁর গান নিয়ে যুগের পর যুগ মুগ্ধ থাকবে বাঙালি। তাঁর আদর্শ ছিল শুধু গান করে নিজের ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করা নয়। আদর্শ ছিল বাংলা গানের উৎকর্ষ সাধন। তিনি ছিলেন নির্লোভ। হেসে খেলে আর গান করে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তবে জীবনের শেষ বেলায় অসুস্থ অবস্থায় মনে কিছুটা অভিমান এসেছিল। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পথে পথে গান করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সে সময় গান গেয়ে পাওয়া ১২ লাখ রুপি তিনি বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছেন। দেশ যখন অনেক সমৃদ্ধ, তাঁর জীবনের শেষ বেলায় অসুস্থতার সময় অর্থের অভাব তাঁকে তাড়না করেছিল। তবুও নিষেধ করেছিলেন কেউ যেন তাঁকে করুনা না করে।

তিনি বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই কণ্ঠযোদ্ধা ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেছেন। পাঁচ দশকের বেশি সময় গানের ভুবনে আলো ছড়ানো শিল্পী আবদুল জব্বার দেশের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তাঁর শূন্যতা বাঙালি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আবদুল জব্বারের প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম “কোথায় আমার নীল দরিয়া” প্রকাশিত হয় জীবনের শেষ বেলায় ২০১৭ সালে। কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক এবং ২০০৩ সালে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। সংগীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০ টি বাংলা গানের তালিকায় তাঁর গাওয়া “তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়”, “সালাম সালাম হাজার সালাম” ও “জয় বাংলা বাংলার জয়” গান তিনটি স্থান পায়। আবদুল জব্বারের গান বাঙালির হৃদয়ে থাকবে চিরদিন, চির অম্লান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভিউয়ের বাজারে মনোযোগ যখন পণ্য
পরবর্তী নিবন্ধসাউদার্ন ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টি বোর্ডের ৮১তম সভা