সকালে ঘুম ভাঙার পর মোবাইলের পর্দায় প্রথম যে ভিডিওটি চোখে পড়ল, সেটি হয়তো কোনো দুর্ঘটনার। কয়েক সেকেন্ড পর একজন তারকার ব্যক্তিগত জীবনের খবর। তারপর রাজনৈতিক নেতার উত্তেজিত বক্তব্য, একটি হাসির ভিডিও, কোনো অপরাধের দৃশ্য কিংবা এমন একটি শিরোনাম– ‘শেষ পর্যন্ত যা ঘটল, বিশ্বাস করতে পারবেন না’। আধঘণ্টায় মানুষ বহু ঘটনা দেখে ফেলছে, কিন্তু দিনের শেষে তার কতটুকু মনে থাকছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন–এই নিরন্তর দেখা আমাদের জানাচ্ছে বেশি, নাকি ধীরে ধীরে গভীরভাবে জানার ক্ষমতাটাই কমিয়ে দিচ্ছে?
একসময় সংবাদপত্র ও টেলিভিশনও পাঠক–দর্শকের সংখ্যা নিয়ে ভাবত। জনপ্রিয়তা তখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সম্পাদকীয় বিবেচনায় অন্তত একটি ধারণা কাজ করত–মানুষ যা দেখতে চায় এবং মানুষের যা জানা প্রয়োজন, দুটি সব সময় এক নয়। ডিজিটাল যুগে এসে এই ব্যবধান দ্রুত সংকুচিত হয়েছে। এখন একটি কনটেন্ট কতজন দেখল, কতক্ষণ দেখল, কতজন শেয়ার করল–সবই মুহূর্তে মাপা যায়। ফলে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ শব্দটির পাশে এসে বসেছে আরেকটি শক্তিশালী শব্দ-‘ভাইরাল’। এটাই ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগের অর্থনীতির মূল জায়গা। এখানে আমাদের মনোযোগই মূল্যবান সম্পদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অধিকাংশ বড় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে সরাসরি টাকা দিতে হয় না; কিন্তু ব্যবহারকারী সেখানে সময় দেন, আচরণের তথ্য তৈরি করেন এবং বিজ্ঞাপন দেখেন। ফলে প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষকে যতক্ষণ সম্ভব পর্দার সামনে ধরে রাখা। সমস্যা হলো, মানুষের মনোযোগ সব ধরনের বিষয়ে সমানভাবে আটকে থাকে না। বিস্ময়, ভয়, রাগ, যৌনতা, সংঘাত কিংবা কৌতূহল অনেক সময় শান্ত বিশ্লেষণের চেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ২০১৮ সালে ঝপরবহপব সাময়িকীতে প্রকাশিত বহুল আলোচিত এক গবেষণায় টুইটারে সত্য ও মিথ্যা সংবাদের বিস্তার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মিথ্যা সংবাদ সত্যের তুলনায় দ্রুত ও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়েছে; গবেষকেরা অভিনবত্ব এবং মানুষের আবেগী প্রতিক্রিয়াকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তির নয়, মানুষের মনস্তত্ত্বের সঙ্গেও জড়িত।
এই জায়গাতেই ভিউয়ের ব্যবসা একটি সমাজের মননশীলতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। কারণ কোনো সমাজ দীর্ঘ সময় ধরে কী দেখে, কী পড়ে এবং কী নিয়ে আলোচনা করে–তার সঙ্গে সেই সমাজের রুচি ও বিচারবোধের সম্পর্ক আছে। যদি একটি হত্যাকাণ্ডের সামাজিক কারণ বিশ্লেষণের চেয়ে হত্যার ভিডিও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব বোঝার চেয়ে নেতার উত্তেজক দশ সেকেন্ডের বক্তব্য বেশি ছড়ায়, তাহলে ধীরে ধীরে ঘটনার চেয়ে প্রতিক্রিয়াই বড় হয়ে উঠতে পারে। সংবাদমাধ্যমেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠক টানার প্রতিযোগিতায় শিরোনাম অনেক সময় খবরের সারবস্তুর চেয়ে বেশি উত্তেজক হয়ে ওঠে। ‘তোলপাড়’, ‘বিস্ফোরক’, ‘মুখ খুললেন’, ‘একহাত নিলেন’–এ ধরনের শব্দ পাঠককে ক্লিক করাতে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাকে যদি নাটক হিসেবে পরিবেশন করা হয়, তাহলে সত্যিকার অর্থে গুরুতর ঘটনা আর সামান্য বিনোদনের মধ্যকার পার্থক্যও অস্পষ্ট হতে থাকে।
ভিউয়ের সংস্কৃতির আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে ব্যক্তিজীবনে। আগে মানুষ কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেত, তারপর হয়তো তার গল্প বলত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে প্রদর্শনের প্রস্তুতিও চলে। কোথায় গেলাম, কী খেলাম, কী কিনলাম থেকে শুরু করে অসুস্থতা, বিচ্ছেদ, মৃত্যু কিংবা শোকও কখনো কনটেন্টে পরিণত হচ্ছে। এমনকি দুর্ঘটনায় আহত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার আগে মোবাইল বের করে ভিডিও করার দৃশ্যও অপরিচিত নয়। এখানে প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, দৃষ্টিভঙ্গির–একজন বিপন্ন মানুষকে আমরা প্রথমে মানুষ হিসেবে দেখছি, নাকি সম্ভাব্য দৃশ্য হিসেবে?
তবে এর দায় শুধু ব্যবহারকারীর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যাটি বোঝা যাবে না। মানুষ বরাবরই কৌতূহলী; গুজব, কেলেঙ্কারি, সহিংসতা কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহও নতুন নয়। নতুন হলো সেই কৌতূহলকে শনাক্ত, পরিমাপ এবং অর্থে রূপান্তর করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। কোন ভিডিওতে মানুষ থামল, কোনটি শেষ পর্যন্ত দেখল, কোনটিতে মন্তব্য করল–এসব সংকেত ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মের সুপারিশ ব্যবস্থা পরবর্তী কনটেন্ট নির্বাচন করতে পারে। ফলে আমরা যা পছন্দ করি, তার আরও বেশি আমাদের সামনে আসতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার একটি সম্ভাব্য ক্ষতি হলো চিন্তার জটিলতা কমে যাওয়া। বাস্তব পৃথিবী সাদা–কালো নয়। একই ঘটনায় একাধিক সত্য থাকতে পারে; একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যার কারণ বুঝতে ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তর দেখতে হয়। কিন্তু দ্রুতগতির কনটেন্টে এত জায়গা নেই। সেখানে কয়েক সেকেন্ডে পক্ষ নিতে হয়–পক্ষে না বিপক্ষে, নায়ক না খলনায়ক। ধূসর অঞ্চলটি হারিয়ে যায়।
মনোযোগ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ছোট ভিডিও দেখা মানেই মানুষের চিন্তাশক্তি নষ্ট হচ্ছে–এমন সরল সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু গবেষকেরা ডিজিটাল বিভ্রান্তি, ক্রমাগত কাজ বদলানো এবং মনোযোগের বিচ্ছিন্নতার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন। তাই সমস্যাটিকে ‘নতুন প্রজন্ম আর বই পড়তে পারে না’ ধরনের অভিযোগে নামিয়ে না এনে প্রশ্ন করা ভালো–আমাদের দৈনন্দিন তথ্যপরিবেশ কি দীর্ঘ সময় একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখাকে উৎসাহিত করছে, নাকি প্রতি মুহূর্তে পরের উদ্দীপনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? এর সবচেয়ে বড় মূল্য হয়তো দিতে হয় সেইসব বিষয়কে, যাদের স্বভাবই ধীর। ইতিহাস বুঝতে সময় লাগে, সাহিত্য পাঠে মনোযোগ লাগে, বিজ্ঞান বুঝতে প্রশ্ন করতে হয়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অপেক্ষা করতে হয়। একটি গভীর প্রবন্ধ পাঁচ হাজার মানুষ পড়তে পারে, আর একটি কেলেঙ্কারির ভিডিও দেখতে পারে পঞ্চাশ লাখ। যদি সংখ্যাই মান নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি হয়ে যায়, তাহলে প্রথম ধরনের কাজ ক্রমশ অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন হবে।
তবু ভিউকে পুরোপুরি শত্রু ভাবার কারণ নেই। ডিজিটাল মাধ্যম বহু প্রান্তিক মানুষকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে, প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে এনেছে, জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে অসংখ্য মানুষের নাগালে পৌঁছে দিয়েছে। সমস্যা ভিউয়ে নয়; সমস্যা তখনই, যখন ভিউ হয়ে ওঠে মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড। একটি জাতির মননশীলতা শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়, বই কিংবা বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা দিয়ে তৈরি হয় না। প্রতিদিন কোটি মানুষ কী দেখছে, কোন বিষয়ে থামছে, কী নিয়ে হাসছে, কোথায় ক্ষুব্ধ হচ্ছে এবং কতক্ষণ একটি চিন্তার সঙ্গে থাকতে পারছে–এসবও তার অংশ। তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভালো না খারাপ–এত সরল নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি আমাদের পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে জানতে, নাকি ভিউয়ের বাজার ধীরে ধীরে ঠিক করে দিচ্ছে–কোন জিনিসকে আমরা দেখার যোগ্য মনে করব?











