প্রথম দিনেই ১৮ উইকেট, ১০১ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ

দ্বিতীয় টেস্ট । সকালে স্টার্কের আগুন, বিকেলে শরিফুলের ঝড়

ক্রীড়া প্রতিবেদক | রবিবার , ২৩ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ

দুই বাঁ হাতি পেসার মিচেল স্টার্ক এবং শরিফুল ইসলামের বোলিং ঝলকে ম্যাকাইয়ের টেস্টের প্রথম দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৮ উইকেটের উথালপাথাল দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে অনেকটাই। তবে ব্যাটিং ব্যর্থতার পর লড়াইয়ে ফিরে বাংলাদেশও দিন শেষ করে মুখে হাসি নিয়ে। গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনার উইকেটে ছিল তাজা ঘাস। তাতে মিলেছে বাউন্স ও মুভমেন্ট। সেখানে টস হেরে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়ে যায় ৬৪ রানেই। রেকর্ডময় বোলিংয়ে প্রথম স্পেলেই ৫টিসহ মোট ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে ছন্নছাড়া করে তোলেন স্টার্ক।

বাংলাদেশের প্রথম ছয় ব্যাটারের চারজনই ফেরেন শূন্য রানে। দলের সর্বোচ্চ ১৪ রান আসে শেষ ব্যাটার শরিফুলের ব্যাট থেকে। এরপর তিনি জ্বলে ওঠেন নিজের আসল কাজে। চোট কাটিয়ে ফেরা পেসার সুইং, মুভমেন্ট ও বাউন্সারের মিশেলে দুর্দান্ত বোলিংয়ে ম্যাচে ফেরান দলকে। আগে ১৩ টেস্টে কখনও ইনিংসে ৩টির বেশি উইকেট পাননি। এবার এক দিনেই তার শিকার ৬ উইকেট। ১১ নম্বরে নেমে দলের সর্বোচ্চ রান এবং বল হাতে ৫ উইকেট শিকারের যুগলবন্দি টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসেই আর নেই। অস্ট্রেলিয়া দিন শেষ করে ৮ উইকেটে ১৬৫ রানে। তাতে তারা ১০১ রানে এগিয়ে এখন। এই ম্যাচের প্রেক্ষাপটে বড় লিডই বলতে হবে। বাংলাদেশ যে লড়াই থেকে প্রথম দিন ছিটকে পড়েনি তা তারা ঠিকই বুঝেছে। সকালে বাংলাদেশের বিপদের শুরু ম্যাচের প্রথম বল থেকেই। স্টার্কের বলে ফ্লিক করার চেষ্টায় গালিতে ধরা পড়েন সাদমান ইসলাম। ম্যাচের প্রথম বলেই চারবার উইকেট শিকার করা টেস্ট ইতিহাসের একমাত্র বোলার এখন স্টার্ক। টেস্ট ইনিংসের প্রথম বলে স্টার্কের উইকেট হলো এখন পাঁচটি। কোনো ভেন্যুর প্রথম টেস্ট বলে উইকেট পতনের চতুর্থ নজির এটি।

শুরুর ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই টালমাটাল হয়ে পড়ে বাংলাদেশের ইনিংস। স্টার্কের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলটি আলগা শটে স্লিপে তুলে দেন তানজিদ হাসান। অনায়াসেই ছেড়ে দেওয়া যেত সেই বলটি। পরের বলে এলবিডব্লিউ নাজমুল হোসেন শান্ত। রিভিউতে দেখা যায়, বল কোনোরকমে সামান্য স্পর্শ করছিল লেগ স্টাম্পের বাইরের অংশ। অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ অধিনায়ক মাঠ ছাড়েন মাথা নাড়তে নাড়তে। স্টার্ক ততক্ষণে যেন রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছেন। তার বোলিং তোপে বাংলাদেশ তখন কাঁপছে। সেই ভয়ের বলি মুমিনুল হক। দুটি চার মারতে পারলেও ছেড়ে দেওয়ার বলে ব্যাট পেতে দিয়ে গালিতে ক্যাচ দেন অভিজ্ঞ ব্যাটার।

স্টার্কের পরের ওভারে স্লিপে সহজতম এক ক্যাচ হাতছাড়া করেন বিউ ওয়েবস্টার। তবে বেঁচে গেলেও টিকতে পারেননি লিটন কুমার দাস। পরের বলেই এলবিডব্লিউ। প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরের দুই ইনিংসেই শূন্যতে ফিরলেন এই কিপারব্যাটার। ২২ বলের মধ্যে স্টার্ক পূরণ করে ফেলেন ৫ উইকেট, টেস্ট ইতিহাসে যা ষষ্ঠ দ্রুততম। ১৫ বলে ৫ উইকেট নিয়ে দ্রুততমও তিনিই। তার প্রথম স্পেলের চেহারা ছিল অবিশ্বাস্য ৬৫।

স্টার্ক আক্রমণ থেকে সরে গেলেও রেহাই মেলেনি বাংলাদেশের ব্যাটারদের। এক প্রান্তে এক ঘণ্টার বেশি সময় লড়াই করে উইকেট আঁকড়ে ছিলেন মুশফিকুর রহিম। তার ৬৯ মিনিটের ইনিংস শেষ হয় কামিন্সের ভেতরে ঢোকা বলে বোল্ড হয়ে। ৪২ বলে ৫ রান করেন মি. ডিপেন্ডেবল। দলের রান তখন ৬ উইকেটে ২১। চোখ রাঙাচ্ছিল টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্কোরের শঙ্কা। সেখান থেকে ১৫ রানের একটি ছোট্ট জুটি দলের জন্য আসে বড় স্বস্তি হয়ে। নিউজিল্যান্ডের ২৬, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৭, দক্ষিণ আফ্রিকার ৩০ রানের স্কোরগুলি এই জুটিতে পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।

৬ উইকেটে ৩৫ রান নিয়ে লাঞ্চে যায় বাংলাদেশ। উইকেটের অবস্থা বুঝে বেশ নির্ভরতায় ব্যাট করছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে লাঞ্চের পর আর কোনো রান যোগ না করেই ভেঙে যায় মিরাজের প্রতিরোধ। ৫১ বলে ১১ রানে ফিরে যান মিরাজ। হাসান মাহমুদকে ফিরিয়ে প্রথম উইকেট পান জশ হ্যাজেলউড। তবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৬ রানের স্কোর ততক্ষণে পেরিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। নবম উইকেটের পতন হয়ে যায় অবশ্য ৩৯ রানে। দলীয় ফিফটিকে তখন মনে হচ্ছিল অনেক দূরের পথ। শেষ জুটিতে আনন্দময় বিস্ময় উপহার দেন তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল। দুজনের ব্যাট থেকে আসে ৫টি বাউন্ডারি। ২৫ রানের শেষ জুটি ভেঙে ইনিংস শেষ করেন স্টার্ক। ১২ রানে ৬ উইকেট তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেরা বোলিং। কামিন্স ২৫ রানে নেন ৩ উইকেট।

এদিকে সাড়ে তিন বছর পর ফেরা ম্যাট রেনশকে দ্রুত ফিরিয়ে বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন তাসকিন আহমেদ। বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আভাস দিচ্ছিলেন ট্রাভিস হেড। প্রথম পরিবর্তিত বোলার হিসেবে আক্রমণে এসে দ্বিতীয় বলেই তাকে থামান শরিফুল। সিরিজের তিন ইনিংসে তৃতীয়বার প্লেড অন বাঁহাতি এই ওপেনার। শরিফুলের ওই ওভারেই পায়ের পেছন দিয়ে বোল্ড হয়ে গেলেন ছন্দ পেতে ধুঁকতে থাকা মার্নাস লাবুশেন।

বাংলাদেশ তখন দারুণ উজ্জীবিত। কিন্ত আগের টেস্টের নায়ক হাসান মাহমুদ ছিলেন এ দিন অধারাবাহিক। তাসকিনও পারেননি চাপ ধরে রাখতে। এই সুযোগে স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন গড়ে তোলেন জুটি। এই জুটিতে লিড নিয়ে একশও ছাড়িয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের শরীরী ভাষাও যেন নুইয়ে পড়ছিল। ত্রাতা হয়ে আসেন শরিফুল। ৪২ রান করা স্মিথকে ফিরিয়ে তিনি ভাঙেন ৭৭ রানের জুটি। গোটা দিনে বাংলাদেশের সেরা সময়টি আসে সেখান থেকেই। ৩০ রানের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া হারায় ৫ উইকেট।

বাঁহাতি অ্যালেক্স কেয়ারি ক্রিজে আসতেই মিরাজকে আক্রমণে আনেন অধিনায়ক। এই অফ স্পিনারের প্রথম ওভারেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে শট খেলতে গিয়ে আউট হন ৫০তম টেস্ট খেলতে নামা কিপারব্যাটার। এরপর শরিফুলশো। দারুণ ডেলিভারিতে বিউ ওয়েবস্টারকে এলবিডব্লিউ করার পর ওই ওভারেই বাউন্সারে চমকে দিয়ে আউট করেন কামিন্সকে। পরের ওভারে বোল্ড করে দেন স্টার্ককে। তার বাউন্সারে চমকে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছিলেন গ্রিনও। কিন্তু সময়মতো বলের নিচে যেতে পারেননি হাসান। সেই গ্রিন দিন শেষে অপরাজিত ৫১ রানে। ন্যাথান লায়নের সঙ্গে তার ১৭ রানের জুটিতে এ দিন আর অলআউট হয়নি অস্ট্রেলিয়া। তবে বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিতে পারেনি। ৩৫ রানে ৬ উইকেট শিকার করা শরিফুলের দিনে তাসকিন এবং মিরাজ পান ১টি করে উইকেট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্লিপার বাসে আগুন, জানালা ভেঙে যাত্রীদের বের করলেন স্থানীয়রা
পরবর্তী নিবন্ধগভীর খাদে দলছুট হাতি, চার ঘণ্টার চেষ্টায় উদ্ধার