মহাকাশে নতুন ধরনের মহাজাগতিক বস্তু

| শনিবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ

মহাকাশে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ‘ব্ল্যাক হোল স্টার’ বা ব্ল্যাক হোল তারা নামের এই বস্তুটি দেখতে আমাদের সৌরজগতের সমান বড় এক সূর্যের মতো। বস্তুটি সাধারণ যেকোনো তারার তুলনায় ১০ হাজার কোটি গুণ শক্তি নির্গত করছে, যা একটি ব্ল্যাক হোলের আচরণের সঙ্গে মেলে। খবর বিডিনিউজের।

গবেষকরা বলছেন, এটি তারা ও ব্ল্যাক হোলের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। আর মহাবিশ্বের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে জটিল কিছু রহস্য উন্মোচনে বস্তুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের পর থেকে তোলা প্রায় প্রতিটি ছবিতে বিজ্ঞানীরা অসংখ্য ছোট লাল বিন্দু দেখতে পেয়েছেন। মহাকাশজুড়ে এগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও এগুলো আসলে কী তা নিয়ে এতদিন সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। নতুন এ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, সেইসব লাল বিন্দুর সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে এই ‘ব্ল্যাক হোল স্টার’। এর আগে মহাবিশ্বে এমন কোনো বস্তুর উপস্থিতি দেখা যায়নি।

মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের পরপরই কীভাবে সূর্য অপেক্ষা কোটি কোটি গুণ ভারী দানবাকার ব্ল্যাক হোলগুলো গঠিত হতে পেরেছিল বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নতুন এ আবিষ্কার।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুমান, বস্তুটি ঘন ও বিশাল এক গ্যাসের মেঘ। সাধারণ তারার মতো এতে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে না, বরং এর কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোলটি থেকে এটা প্রয়োজনীয় শক্তি পায়।

এ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও এমআইটির কাভলি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিঙ অ্যান্ড স্পেস রিসার্চের গবেষক রোহান নাইডু বলেছেন, বস্তুটি নিয়ে আমাদের ধারণা খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে। আমরা ধারণা করছি, এর কেন্দ্রে সূর্যের চেয়ে এক লাখ গুণ ভারী একটি ব্ল্যাক হোল রয়েছে। সেই ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘিরে থাকা বড় বিস্তৃত গ্যাসের আস্তরণটি দেখতে পুরো সৌরজগতের আকারের একটি তারার মতো দেখায়। এটা আসলেই বিশাল।

গবেষণায় আবিষ্কৃত বস্তুটির নাম ‘মওমবিএইচ*-ওয়ান’। বস্তুটি পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে অবস্থিত যে, এর থেকে আসা আলো ১৩০০ কোটি বছর আগের, যা বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্ব তৈরির কেবল ৬৬ কোটি বছর পরের ঘটনা।

একই গবেষণায় ‘মওমজেড১৪’ নামে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে দূরবর্তী ছায়াপথের সন্ধানও পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় আবিষ্কৃত বস্তু দুটির নাম এদের পরিচালিত প্রজেক্ট মিরেজ অর মিরাকলের মঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের উজ্জ্বল ও দূরবর্তী ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করাই ছিল এ গবেষণার মূল লক্ষ্য।

গবেষকরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তুর নাম দিয়েছেন ‘ব্ল্যাক হোল স্টারওয়ান’। বস্তুটি মহাকাশে আবিষ্কৃত প্রথম ব্ল্যাক হোল স্টার ও ভবিষ্যতে এমন আরো অনেক বস্তুর সন্ধান মিলবে। ফলে মহাকাশের সেই রহস্যময় ছোট লাল বিন্দুগুলোর জট শেষ পর্যন্ত খুলে যেতে পারে।

গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অধ্যাপক রোহান নাইডু বলেছেন, প্রতিটি ছোট লাল বিন্দুর বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য প্রাচীন ছায়াপথে থাকা এসব ব্ল্যাক হোল স্টারের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তবে নতুন বস্তুটির বিশেষত্ব এটা মূল ছায়াপথের আলোকে পুরোপুরি ম্লান করে দিয়েছে। ফলে আমরা একদম খাঁটি ব্ল্যাক হোল স্টারের নির্গত আলো দেখতে পাচ্ছি।

বিজ্ঞানীরা সরাসরি কোনো ব্ল্যাক হোল স্টার খোঁজার উদ্দেশ্যে এই গবেষণা শুরু করেননি। মিরেজ অর মিরাকল প্রজেক্টের কাজ ছিল প্রাচীন বিভিন্ন ছায়াপথ আদতে মহাবিশ্বের একদম শুরুতে গঠিত হয়েছিল কি না তা পরীক্ষা করা। তবে টেলিস্কোপের ছবি বিশ্লেষণের সময় অস্বাভাবিক লাল ও তীব্র উজ্জ্বল বিন্দু তাদের নজরে আসে।

গবেষণার সহলেখক রবার্ট সিমকো বলেছেন, মহাকাশে লাল রঙের কোনো বস্তু দেখা গেলে সাধারণত ধরে নেওয়া হয় সেটি ধূলিকণায় ঢাকা রয়েছে। যেমন কানাডার দাবানলের ধোঁয়া বস্টনের আকাশকে লালচে করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনই মহাজাগতিক বস্তুও ধূলিকণার আড়ালে থাকলে আসল রঙের চেয়ে বেশি লাল দেখায়।

তবে বস্তুটির আলো বিশ্লেষণ করে ধূলিকণার এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়। এছাড়া বস্তুটি অদ্ভুত কিছু আচরণ করছিল, যেমন তীব্র উজ্জ্বল হলেও নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নিচে এর আলো সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যাচ্ছিল এবং এতে কোনো ধাতু বা ভারী মৌলের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। প্রথম সিমুলেশনে দেখা যায়, বস্তুটি হাইড্রোজেন গ্যাসে ঘেরা শক্তির একটি উৎস। তবে এত বিপুল পরিমাণ উজ্জ্বলতার কারণ সেখানে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবান্দরবানে বর্জ্যে ঢেকেছে ১০ একর ফসলি জমি
পরবর্তী নিবন্ধজশনে জুলুসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করা হোক