খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো বিষয় নয়। এ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য প্রতিবেদন। ভেজাল বিরোধী অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে কিছুদিন পর পর। খাবারের মান নির্ণয় করতে রেস্তোরাঁগুলোর জন্য গ্রেডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সব কিছুর পরও দূষিত ও ভেজাল দেওয়ার বিষয়টি যেন নির্ভেজালই থেকে গেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাটাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেশের খাদ্যপণ্যের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ঢাকাসহ ১৯টি জেলা থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় শাকসবজিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি সিসা ও ক্যাডমিয়াম, সুপেয় পানিতে মলের জীবাণু (ফিকাল কলিফর্ম), শিশুখাদ্যে অতিরিক্ত সিসা ও প্রিজারভেটিভ এবং মুড়ি, গুড় ও জিলাপিতে ইউরিয়া ও সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইটের মতো শিল্প–রাসায়নিকের উপস্থিতি বিএফএসএ’র প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে। এমনকি ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ–এর ঘাটতি এবং লবণে আয়োডিনের অপর্যাপ্ততারও প্রমাণ মিলেছে। এটি প্রমাণ করে, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং কার্যকর নজরদারির অভাবে দেশের খাদ্যশৃঙ্খল কতটা বিষাক্ত হয়ে পড়েছে।
বলা বাহুল্য, প্রতিদিন রাজধানীর ৬৩ লাখ মানুষকে মধ্যাহ্নভোজসহ দিন–রাতে হোটেল–রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু মানুষ জেনে বা না জেনে অথবা কোন উপায় না পেয়ে একরকম বাধ্য হয়ে নিম্ন মানের খাবার পরিভোগ করছে। শুধু হোটেল– রেস্তোরাঁয় নিম্নমানের খাবার নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সিংহভাগ পণ্যই ভেজাল বা বিষক্রিয়ার বাইরে নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের খাবার, অনিরাপদ পানিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যে ভেজালের কারণে মানবস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো, জীবন ধারণের জন্য যে খাবার মানুষ প্রতিদিন গ্রহণ করছেন, তা–ই আজ ধীরগতির বিষে পরিণত হয়ে ডেকে আনছে অকালমৃত্যু। ফলে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভারের ক্ষতি, হৃদরোগ কিংবা শিশুদের মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার মতো নীরব মহামারি আজ ঘরে ঘরে। অতিমুনাফালোভীদের এই বিবেকহীনতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক শিথিলতার কারণে পুরো জাতি আজ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, দুই লাখ মানুষ কিডনি রোগে, দেড় লাখ ডায়াবেটিসে ভোগেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ করে, যার অনেকাংশই গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতা থেকে উদ্ভূত। এ ভয়াবহ প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন আমাদের প্রয়োজন বিশুদ্ধ, টাটকা, সংরক্ষকবিহীন, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকমুক্ত, পুষ্টিকর খাবার। অথচ মুনাফার লোভে দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাদ্যে শিল্পজাত রাসায়নিক, রঙ এবং কৃত্রিম উপাদান মেশাচ্ছেন। যদিও আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী এ সমস্যা সমাধানে কাজ করছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা ভেজালকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শক্তিশালী চক্র আইনকে পাশ কাটিয়ে এমনভাবে নকল খাদ্য উৎপাদন করছে, যেখানে মূল উপাদানের বদলে কম খরচের, ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্য, তেল–চর্বি, ফলমূল, ঘি, শাকসবজি, দানাজাতীয় খাদ্য, মধু, চা–কফি ইত্যাদি খাদ্যে ভেজালের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং এটি অনেক সময় জীবনঘাতী হয়ে উঠছে। খাদ্যে ভেজালের কারণে অ্যালার্জি, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, অঙ্গ–প্রত্যঙ্গের ক্ষতি, হরমোন ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘস্থায়ী রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খাদ্যের পুষ্টিগুণ ধ্বংস হয়।
তাই ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে দরকার কার্যকর ভূমিকা। ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলে কিছুদিন ভেজালমুক্ত খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যায়, কিন্তু পরে যেই–সেই হয়ে যায়। এর থেকে পরিত্রাণে আমাদের সামাজিকভাবেও নীতি–নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সৎ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সততা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আলোকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নৈতিকতাবোধ, উৎপাদক, বিপণনকারী, ভোক্তা সবাইকেই সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।







