প্রবাহ

চট্টগ্রামের উজ্জ্বল নক্ষত্র এ কে খান

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ১২ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এবং শিল্পজগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মানব কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ আবুল কাশেম খান চট্টগ্রামের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সর্বমহলে এ কে খান নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর পিতা আলহাজ আবদুল লতিফ খান সরকারি রেজিস্ট্রেশন বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯০৫ সালের ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের মোহরা গ্রামে এ কে খান জন্মগ্রহণ করেন। ফতেয়াবাদ হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএ পাস করে কলকাতায় চলে যান। সেখানকার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯২৭ সালে কৃতিত্বের সাথে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন।

বাল্যকাল থেকেই তাঁর আইনজ্ঞ হওয়ার তীব্র বাসনা ছিল। তাই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়ে পড়া শুরু করেন এবং ১৯৩৩ সালে বিএল ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে ২য় স্থান অধিকার করেন। ১৯৩৩ সালেই কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। একই বছর তিনি মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) প্রখ্যাত ব্যবসায়ী এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা আবদুল বারী চৌধুরীর কন্যার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আবদুল বারী চৌধুরী ছিলেন সেই সময়কার বাংলা ও মায়ানমারের এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব এবং বিখ্যাত ‘বেঙ্গল বার্মা স্টিম নেভিগেশন’ কোম্পানির মালিক। ইয়াঙ্গুনে তাঁর একাধিক ব্যবসা ছিল। এই বিয়ে উপলক্ষে বরযাত্রী দল চট্টগ্রাম থেকে ইয়াঙ্গুন গমন করেন। সেখানে রাজকীয় বিয়ের আয়োজন করা হয়।

সংসারের হাল ধরার জন্য এ কে খান মুন্সেফের (বিচারক) চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থানে মুন্সেফ হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। একজন ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী বিচারক হিসেবে এক শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিককে দোষী সাব্যস্ত করে তিনি রায় প্রদান করেন। এই ঘটনায় ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের হাতে মায়ানমারের পতন আসন্ন বুঝতে পেরে তাঁর শ্বশুর আবদুল বারী চৌধুরী ইয়াঙ্গুন থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন। সে সময় আবদুল বারী চৌধুরীর ছেলেরা ছোট থাকায় তিনি জামাতা এ কে খানকে ব্যবসায় যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। শ্বশুরের আবদারে ১৯৪৩ সালে বিচারকের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করেন। উল্লেখ্য, চাকরি জীবনে তিনি দুবার আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মাণ ঠিকাদার হিসেবে ব্যবসায় পদার্পণ করেই তিনি বিপুল সাফল্য অর্জন করেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে এ কে খান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। তিনি জানতেন, দেশের শিল্পের বিকাশ ঘটলে একই সাথে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি পুরোপুরি শিল্প প্রতিষ্ঠার দিকে মনোনিবেশ করেন।

১৯৫২ সালে কালুরঘাট এলাকায় একটি দিয়াশলাই (ম্যাচ) কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পজগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর একই এলাকায় তিনি একটি প্লাইউড কারখানা স্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘চিটাগাং টেক্সটাইল মিলস’, যা তৎকালীন দেশের একটি অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হতো। শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার এই যাত্রায় তাঁকে পদে পদে নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, কারণ তৎকালীন ব্যাংক ও ব্যবসাবাণিজ্যের যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। এ কে খান বিশ্বাস করতেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য মালিককে সবসময় উৎপাদন কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হয়; দূর থেকে কারখানা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তিনি তাঁর বেশির ভাগ সময় কারখানায় কাটাতে পছন্দ করতেন এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।

তিনি তাঁর শিল্পসাম্রাজ্যের শ্রমিকদের অত্যন্ত মূল্যায়ন করতেন এবং তাঁদের অধিকারকে গুরুত্ব দিতেন। শিল্প ও ব্যবসার পাশাপাশি এ কে খান রাজনীতিতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন।

আইয়ুব খানের শাসনামলে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি দেশের শিল্পনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করেন। ওই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পজগতে অবঙালিদের আধিপত্য ছিল। বাঙালি শিল্পপতির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাঙালিরা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। বাঙালি শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার জন্য তিনি তৎকালীন পিআইডিসিকে বিভক্ত করে ‘ইপিআইডিসি’ (পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা) ও ‘ডব্লিউপিআইডিসি’ (পশ্চিম পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা) নামে দুটি পৃথক সংস্থা গঠন করেন। তাঁর এই সাহসী ও বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে অনেক বাঙালি উদ্যোক্তা নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসার সাহস পান।

দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কোনো মানুষ যদি সুশৃঙ্খলভাবে, প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে, তবে জীবনে সাফল্য না আসার কোনো কারণ নেই। নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব এ কে খানের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ছিল। সমসাময়িক নানা বিষয়ের সর্বশেষ খবরাখবর রাখার প্রতি তাঁর সদা সর্বদা তীক্ষ্ন নজর ছিল।

১৯৪৭ সালের আগে এই অঞ্চলে কিছু বস্ত্রকল, সুতাকল এবং সামান্য রাসায়নিক শিল্প স্থাপিত হলেও সেগুলো ছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রীক। তদানীন্তন পূর্ব বাংলা তখন কেবল কলকাতার শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকারী অঞ্চল হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। পাকিস্তান আমলে শিল্পমন্ত্রী হওয়ার পর এ দেশে শিল্পায়নে এ কে খান যে অনন্য অবদান রেখেছিলেন, তা এ দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব হয়নি। শিল্পক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ১ নম্বর শিল্পপতি এবং আমৃত্যু তিনি এই অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। দেশের শিল্পখাতে কার অবদান কতটুকুতা বিচার করতে গেলে এ কে খানের নাম সবার শীর্ষে অবস্থান করবে।

এক নজরে এ কে খানের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ: . দি চিটাগাং টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (১৯৫৪) . এ কে খান প্লাইউড কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৭) . এ কে খান ম্যাচ কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৯) . এ কে ডকিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৯) . খান এলিন কর্পোরেশন লিমিটেড (১৯৬২) . এ কে খান জুট মিলস লিমিটেড (১৯৬৫) . বঙ্গতরী শিপিং কোম্পানি লিমিটেড (১৯৭০) . এস টি এম লিমিটেড (১৯৭৭) . বেঙ্গল ফিশারিজ লিমিটেড (১৯৭৯) ১০. এ কে কোল্ড স্টোরেজ, ফিশ প্রসেসিং আইস অ্যান্ড মেল্টিং প্রজেক্ট (১৯৮৫) ১১. এ কে নিটওয়্যার (১৯৮৫) ১২. এ কে গার্মেন্টস (১৯৮৬) ১৯৮০এর দশকে তাঁর এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।

আমাদের দেশে মূলত ১৯৯০এর দশক থেকে পর্যায়ক্রমে তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ঘরের গৃহিণী ও তরুণী নারীরা এই শিল্পে ব্যাপকভাবে শ্রম দেওয়া শুরু করেন। পাশাপাশি হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা এই শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি শিল্পব্যবসা বাণিজ্যে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। রোটারী ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকতেন। জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ছিলেন। সাইন্টিফিক কমিশনের সভাপতি ছিলেন। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সহযোগী ছিলেন। এক কথায় জন কল্যাণে তথা স্বাস্থ্য শিক্ষাখাতে সেবার জন্য এ কে খান ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিজীবনে এ কে খান ছিলেন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ, ধার্মিক, পরিমার্জিত রুচিবোধসম্পন্ন, কঠোর পরিশ্রমী ও মৃদুভাষী। ইতিবাচক মানসিকতার কারণে কোনো হতাশাই তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি নিজের বাড়িতে একটি সমৃদ্ধ পারিবারিক লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৯৯১ সালের ৩১ মার্চ ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। পরদিন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে জানাজা শেষে বাটালী হিল মসজিদের পাশে তাঁকে যথাযথ দাফন করা হয়। পরকালে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅনলাইন ব্যবসায় গুণগত মান রক্ষায় নিয়ন্ত্রণ দরকার
পরবর্তী নিবন্ধইছামতীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, বিকল ২ ড্রেজার