চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে ধস নেমেছে। এবার পাসের হার নেমে এসেছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। গত বছর এ হার ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
জিপিএ–৫–এর ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বোর্ডে বড় ধাক্কা লেগেছে। গত বছর জিপিএ–৫ পেয়েছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। এবার এ সংখ্যা কমে ৯ হাজার ৩৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন।
গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় সারাদেশের সঙ্গে একযোগে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন পরীক্ষার্থী ছিল। পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। অকৃতকার্য হয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার শিক্ষার্থী। ছাত্রদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ এবারও ফলাফলে ছাত্রদের পেছনে ফেলেছে ছাত্রীরা। গত বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ লাখ ১ হাজার ১৮১ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৩ হাজার ৭২৮ জন।
চট্টগ্রাম, কঙবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডর অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৩, গত বছর এ হার ছিল ৭১ দশমিক ২৯ শতাংশ। কঙবাজারে এবার পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, গত বছর ছিল ৭০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রাঙামাটিতে এবার পাস করেছে ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ, গত বছর ছিল ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বান্দরবানে পাসের হার ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, গত বছর ছিল ৬৩ দশমিক ১২ শতাংশ। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ফল হয়েছে খাগড়াছড়িতে। সেখানে এবার পাস করেছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছর এ হার ছিল ৬০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খাগড়াছড়িতে পাসের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। গত বছর মহানগরে পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ নগরেও ফল খারাপ হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়েও ফলাফলে বড় পতন ঘটেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ফলে জাতীয় গড়ের চেয়েও চট্টগ্রাম বোর্ডের ফল ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বোর্ডভিত্তিক পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৭১.৬৩ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন। অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৬৩.৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ–৫ পেয়েছে ২২ হাজার ৩২৭ জন, যশোর বোর্ডে পাসের হার ৬৬.২৭ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন। কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৬৫.৪২ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৮১৪ জন। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬০.৩৫ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ২ হাজার ৭৭৮ জন। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫৯.৪৮ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫৮.৩৩ শতাংশ এবং জিপিএ–৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন। দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৫৮.০৫ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৬৩৯ জন। ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫৭.৩৯ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬০ দশমিক ১২ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে পাসের হার ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে গত বছরের তুলনায় এ বছর মানবিক বিভাগে পাসের হার কমেছে ১৬.২৩ শতাংশ। গত বছর এ বিভাগে পাশে হার ছিল ৫৫ দশমিক ০২ শতাংশ। এ বছর মানবিকের এ ফল গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিডিনিউজের এক খবরে বলা হয়, চট্টগ্রামের একাধিক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, স্কুলগুলোতে ফলাফলের ভিত্তিতে নবম শ্রেণিতে বিভাগ বণ্টন করা হয়। ভালো শিক্ষার্থীরা সবাই বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। এরপর কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি হয় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে। প্রবণতা অনুযায়ী সার্বিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় মানবিক বিভাগে। ফলে তারা ইংরেজি ও গণিতে ভালো ফলাফল করতে পারে না।
চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী মনে করেন, পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডে সার্বিকভাবে মানবিক বিভাগে বেশি ফল বিপর্যয় হয়। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের বেশিরভাগ স্কুলে মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাদের বড় একটি অংশ ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে থাকে; যার কারণে পুরো ফলাফলের ওপর প্রভাব পড়ে।’ অধ্যাপক সাজ্জাদ এর জন্য পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের ক্লাসের প্রতি অনাগ্রহকেই দায়ী করেন।
চট্টগ্রাম বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, এ বছর সবচেয়ে কম পাস করেছে ইংরেজিতে। সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক এ বিষয়টিতে পাসের হার ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এটি বিষয়ভিত্তিক পাসের সর্বনিম্ন হার। এরপর রয়েছে সাধারণ গণিতে ৮০ দশমিক ০৫ শতাংশ। অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষায় পাশের হার বাংলায় ৯৬ দশমিক ৮৬, সাধারণ বিজ্ঞানে ৯২ দশমিক ৬৩, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি বিষয়ে ৯৯ দশমিক ০৬ শতাংশ, ভূগোল ও পরিবেশে ৯২ দশমিক ২২, পৌরনীতিতে ৯৬ দশমিক ২২, অর্থনীতিতে ৯৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও ধর্মে ৯৯ শতাংশের বেশি।
বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলও এবার বড় ধস দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মাত্র ২১টি বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৩টি। অর্থাৎ শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ১২টি। বিপরীতে এবার আটটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র একটি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা আট গুণ হয়েছে। এই আটটি বিদ্যালয়ে মোট ৮৪ জন পরীক্ষার্থী ছিল। তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।












