বিনয়বাঁশী জলদাস : শৈশবের স্মৃতিতে দাদু

বিপ্লব জলদাস | সোমবার , ১০ আগস্ট, ২০২৬ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয়, আবার একদিন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু সবাই ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে না। যাঁরা তাঁদের কর্ম, আদর্শ, মানবিকতা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তোলেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন কালজয়ী। আমার শ্রদ্ধেয় দাদু, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যন্ত্রসংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদকে ভূষিত, উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঢোলবাদক, কিংবদন্তি লোকশিল্পী ও সংস্কৃতিসাধক ওস্তাদ বিনয়বাঁশী জলদাস ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।

নাম নয়, কাজেই মানুষের পরিচয়’এই প্রবাদটির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন তিনি। নামের মতোই তাঁর জীবন ছিল বিনয়, সততা, মানবিকতা ও সংস্কৃতিপ্রেমে পরিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন নিরহংকার, সহজসরল ও মাটির মানুষ।

আজও শৈশবের সেই ছবিটির দিকে তাকালে স্মৃতির দুয়ার খুলে যায়। সাল ১৯৯৮। তখন আমার বয়স মাত্র দশ বছর। ছবিতে দাদুর পাশে বসে থাকা ছোট্ট ছেলেটি আমি। তখন বুঝতে পারিনি, ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আজ উপলব্ধি করি, তাঁর স্নেহ, শিক্ষা ও আশীর্বাদই আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

ছোটবেলা থেকেই দাদুর সঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। তিনি ঢোল বাজাতেন, আর আমি মন্দিরা বাজিয়ে তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করতাম। চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দাদু বিনয়বাঁশী জলদাস, আমার বাবা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঢোলবাদক শিল্পী বাবুল জলদাস এবং আমিও একসঙ্গে অংশগ্রহণ করি। সেই অভিজ্ঞতাই আমার সাংস্কৃতিক জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

দাদুর জীবন ছিল নিয়মানুবর্তিতা, আধ্যাত্মিকতা ও অসামপ্রদায়িক চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিদিন ভোরে বসুমাতাকে প্রণাম করে তিনি সূর্যদেবতাকে প্রণাম জানাতেন। তাঁর কাছে ধর্ম কখনো বিভেদের নয়, সমপ্রীতির প্রতীক ছিল। মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও প্যাগোডাসহ সব ধর্মের উপাসনালয়ে তিনি সমান শ্রদ্ধায় যেতেন। এ কারণেই ছন্দারিয়া গ্রামের সব ধর্মের মানুষ তাঁকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। সেই আদর্শ থেকেই ২০১০ সালে আমি প্রতিষ্ঠা করি বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠী। বর্তমানে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লোকসংগীত, লোকবাদ্য, সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ, স্মরণসভা ও নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আজ দাদু আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর শিল্পসাধনা, মানবিকতা ও অসামপ্রদায়িক চেতনা আজও আমাদের পথ দেখায়। আমি বিশ্বাস করি, একজন বিনয়বাঁশী জলদাস কখনো হারিয়ে যান না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর কর্ম, আদর্শ ও উত্তরসূরিদের মধ্যে। তাঁর আদর্শকে ধারণ করে আজীবন সংস্কৃতির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। এটাই হবে আমার শ্রদ্ধেয় দাদুর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরিবর্তন হোক নিজের জন্য
পরবর্তী নিবন্ধবুভুক্ষু বিষাদ : জীবনের আখ্যান