হল্যান্ড থেকে

বিতর্কিত ‘ফিফা’ প্রধান কি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবেন?

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ

কথায় আছে ‘পিপীলিকা উড়ে মরিবার তরে’। কথাটা মনে এলো ইনফান্তিনোর পরিণতি দেখে। পৌঁছেছিলেন ক্যারিয়ারের যাকে বলে একেবারে শীর্ষে। দশ বছর ধরে ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের সংস্থা, ‘ফিফারপ্রধান। অনেকটা রাজকীয় ছিল তার চলাফেরা, স্টাইল, কাজকর্ম। তার কাজকর্মে মনে হতো ফুটবল খেলার মান উন্নয়নের চাইতে তিনি নিজেকে ফোকাস করতে বেশি আগ্রহী। সব সময় লাইম লাইটেথাকতে পছন্দ করতেন। পছন্দ করতেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছাকাছি থাকতে। যেমনটি দেখা গেছে তাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছাকাছি থাকতে, ট্রাম্পের গুড বুকেথাকতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুশি রাখার সবধরনের প্রচেষ্টা তাকে করতে দেখা যায়। ফুটবল এবং ফিফার নীতিকে একপাশে রেখে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার কারণে তার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সামপ্রতিক সময়ে তিনি বিশ্বব্যাপী ফুটবল মহলে তো বটেই, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন। তাকে নিয়ে সমালোচনা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে অনেকে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে এখন গোটা ফুটবল বিশ্বে বড় বিপর্যয়হিসাবে দেখতে শুরু করেছে। একই ধরণের মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সাবেক মার্কেটিং প্রধান, মাইকেল পেইন। তার (পেইন) মতে, তাকে ঘিরে বর্তমানে যেসংকট সৃষ্টি হয়েছে তার মূলে রয়েছে তার চরম ঔদ্ধত্য। ইউরোপীয় ফুটবল ফেডারেশন (উয়েফা) সহ গোটা য়ুরোপ জুড়ে ইনফান্তিনোকে পদচ্যুত করার দাবি দিনদিন জোরালো হচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলকে অর্থনৈতিকভাবে নুতন রূপদেবার তার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও উচ্চাভিলাষী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ছিল সেটিই তার ক্যারিয়ারে সব চাইতে বড় সংকট ডেকে এনেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেবল উয়েফা নয়, ৫৬ বছর বয়েসী এই সুইস ক্রীড়া সংগঠকের নেতৃত্বের প্রতি ইতিমধ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থাও। এই সংস্থার সদস্যদের মধ্যে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশআমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোওরয়েছে।

ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও সমালোচনা ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে জোরালো হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুরোধে মার্কিন খেলোয়াড়কে দেখানো লাল কার্ডপ্রত্যাহার করার একক ও অন্যায় সিদ্ধান্ত, বিজয়ীদের মধ্যে কাপ তুলে দেবার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মঞ্চে ডাকা এবং তার সাথে (ট্রাম্প) যৌথভাবে বিজয়ী দলের হাতে কাপতুলে দেয়া নিয়ে ইনফান্তিনোকে কড়া সমালোচনার তোপে পড়তে হয়। কেননা এই সমস্ত সিদ্ধান্ত তিনি অনেকটা এককভাবে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। সব কিছুকে ছাড়িয়ে খেলা শেষ হতে না হতেই তার উর্বর মস্তিষ্কের ফসল ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ‘ (এফএফই) নামে একটি নুতন বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা আসতেই ফুটবল সংশ্লিষ্ট সবাই এক সুরে বলে উঠে, ‘এনাফ ইজ এনাফ। বাড়াবাড়ির একটা সীমারেখা থাকা চাই। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নথিতে জানা যায়, ফিফার পরিকল্পনা ছিল একটি নুতন বাণিজ্য গঠন করে এর প্রায় ২০% শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা এবং এর মাধ্যমে আনুমানিক ৪২০ কোটি ডলার তোলা। পরিকল্পনায় ফিফার ১২১ টি সদস্য দেশের প্রতিটি ফুটবল এসোসিয়েশনকে এককালীন দুই কোটি ডলার দেবার প্রস্তাবও ছিল। ইনফান্তিনোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় পা দেবার জন্যে এ যেন টোপ হিসাবে বড়শিতে মাছগেঁথে দেয়া। কেউ কেউ এই টোপগিললেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উয়েফার সভাপতি আলেক্সান্ডার সেফেরিন স্পষ্ট করে বলেন, এই প্রস্তাব বহাল থাকা অবধি উয়েফার (ইউরোপিয়ান এসোসিয়েশন অফ ফুটবল) কোন সদস্য দেশই ফিফার কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেনা। উয়েফা জানায়, ইনফান্তিনোর এই বিতর্কিতচুক্তি তাদের তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির পেইনের মতে, ইনফান্তিনো যদি তার পদে এতো সমালোচনার পরও বহাল থাকেন তাহলে বিশ্ব ফুটবলে আরো বড় সংকট তৈরী হতে পারে। ইনফান্তিনো শেষ চেষ্টা করেছিলেন ছোট ছোট দেশগুলিকে নিজের পক্ষে রাখতে, তাকে সমর্থন দিতে। এই লক্ষ্যে তিনি লবিও করেছিলেন বলে শোনা যায়। কিন্তু দিন শেষে তা কাজ দেবে বলে মনে হয়না। মোট কথা, তাকে যেতেই হবে। মাঠ ছেড়ে নিজ ঘরে। কিংবা গ্যালারিতে।

) গেল বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে শুরু থেকে ইনফান্তিনোর উপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ প্রভাব দেখা যায়, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নুতন। এর আগে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কোন রাষ্ট্রপ্রধানকে এইভাবে ফুটবল নিয়ে নাক গলাতে দেখা যায়নি এবং একই সাথে কোন ফিফা প্রধানকেও এমনভাবে কোন রাষ্ট্র প্রধানকে তোষামোদ করতে দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শোম্যানশিপপছন্দ করেন এবং সব সময় লাইমলাইটেথাকতে পছন্দ করেন। একই সাথে তিনি জহুরী, জাত বণিক। আর তাই ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত ইনভেস্টমেন্ট কনসোর্টিয়ামেদেখা গেলো ট্রাম্পের জামাতা তার উপদেষ্টা কুশনারের ভাই, জোসুয়া কুশনারের থ্রাইভ ক্যাপিটাল এবং এপোলো স্পোর্টস ক্যাপিটালকে। স্পষ্ট হলো, প্রস্তাবিত এই চুক্তি এবং ট্রাম্পপরিবারের মধ্যে একটি পরোক্ষ যোগসূত্র। এর আগে ফিফা এই বলে যুক্তি দেখিয়েছিল যে, বিশ্বকাপ সহ বড় ধরণের টুর্নামেন্ট আয়োজনে এই স্বতন্ত্র কোম্পানি খুললে লাভবান হবে ফিফার ২১১ সদস্যদেশ। নিন্দুকের মতে, এই উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল ভিন্ন স্বার্থ। এটিকে বিশ্বকাপ বিক্রিরসাথে তুলনা করা হয়। বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে যখন ইনফান্তিনোর তো বটেই, এমনকী ফিফার অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলো ফিফা। গত ১ আগস্ট এক ঘোষণার মধ্যে দিয়ে ইনফান্তিনোর অতি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। তবে ইটস টু লেইট। বাতিল করলেও যেআস্থা ইনফান্তিনো বিগত ১০ বছরে অর্জন করেছিলেন তা ধূলিসাৎ হয়ে গেলো বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে ফিফার প্রেসিডেন্ট পদে ২০২৭২০৩১ সালের মেয়াদের জন্যে নির্বাচন হবার কথা। এই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত পরিকল্পনা ফাঁস হবার আগেও এই পদে ইনফান্তিনোর সম্ভবনা প্রকট ছিল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে এখন মনে হচ্ছে তা বুঝি আর রইলোনা। ইতিমধ্যে ওয়েলস ফুটবল এসোসিয়েশন আগামী নির্বাচনে ইনফান্তিনোর উপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এক বিবৃতিতে এসোসিয়েশন বলে, নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা, নৈতিকতা ও যোগাযোগের সামপ্রতিক ব্যর্থতার কারণে তিনি (ইনফান্তিনো) বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্বে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।

শেষ আশাভরসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার সাথে তার দহরমমহরম আমরা বিগত কয়েকটি মাস ধরে টিভি পর্দায় দেখেছি। গদি রক্ষায় ধর্ণা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পের কাছে। সাহায্য চাইলেন। এই সংবাদ জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক নিউইয়র্ক পোস্ট। এই সংবাদের সূত্র বলে, ইনফান্তিনো মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে কথা বলবেন এই নিয়ে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডিলান জনসনের মতে, এই ধরনের কোন পরিকল্পনা নেই মার্কো রুবিওর। ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর যেভরসা করেছিলেন তা বুঝি আর রইলোনা। ট্রাম্প পরিবারও (কুশনার ভ্রাতা) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ইতিমধ্যে। কেলেঙ্কারিতে গিয়ে আর কাজ নেইভাবখানা এই। সংশ্লিষ্টদের মতে, ফিফা ও ফিফাপ্রধানকে নিয়ে যে সমস্যা তার সত্বর সমাধান অতীব প্রয়োজন। তা না হলে আগামী দিনগুলিতে ফিফার অনুমোদিত বেশ কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টআয়োজন বিঘ্নিত হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৭ সালে ব্রাজিলে নারী বিশ্বকাপ, ২০৩০ বিশ্বকাপ ফুটবল এবং আজারবাইজান ও উজবেকিস্তানে ২০২৭ অনুর্ধ্ব ২০ পুরুষ বিশ্বকাপ। এখন অপেক্ষার পালা। দেখা যাক, ফিফা প্রধান নিজ থেকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান কিনা, নাকি তাকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। (২০২৬)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইবাদতের প্রতি একাগ্রতা ও মনোযোগ রক্ষার সহজ ও কার্যকর আমল
পরবর্তী নিবন্ধদূর হচ্ছে চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজার ও নিশ্চিন্তাপুর সড়কের দুর্ভোগ