বিপুল সংখ্যক যাত্রী চাহিদার কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটের দীর্ঘদিনের ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের শেষ গন্তব্য কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি মাসেই ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে চলাচলরত ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত যাবে নিশ্চিত করেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইতোমধ্যে রেল ভবনের নির্দেশে সিওপিএস দপ্তর থেকে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে চলাচলরত মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত চালানোর ব্যাপারে সময়সূচিসহ সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে প্রস্তাবনা রেল ভবনে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা–কক্সবাজারের যাত্রীরা সমুদ্রসৈকতে চলাচলের জন্য পঞ্চম ট্রেনের সুবিধা পাবেন। নতুন রুট সমপ্রসারণের ফলে ৪৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথের এই ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার বাড়তি যাত্রীর যাতায়াত সুগম হবে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার অংশটি বিরতিহীনভাবে চলাচল করলেও চট্টগ্রাম অংশ পর্যন্ত সাধারণ ট্রেনের ভাড়াই বলবৎ থাকবে, যা যাত্রীসাধারণ ও পর্যটকদের স্বস্তি প্রদান করবে।
চট্টগ্রাম–ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে চলাচলরত ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের রুট কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন। তিনি বলেন, আমরা এই মাসের মধ্যে (মহানগর এক্সপ্রেস) চালু করবো। গত ১ আগস্ট শনিবার রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জানিয়েছেন, চলতি আগস্ট মাসেই ঢাকা–কক্সবাজার রুটে আরও একজোড়া নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।
এই ব্যাপারে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহকারী চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সহকারী সিওপিএস) আবু বকর সিদ্দিক আজাদীকে জানান, চট্টগ্রাম–ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটের ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি কবে থেকে কক্সবাজার যাবে এ বিষয়ে সামনের সপ্তাহে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ট্রেন চালানোর ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি আছে।
গত মাসে রেল ভবনের নির্দেশে আমরা ট্রেনটির সময়সূচিসহ সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে প্রস্তাবনা রেল ভবনে পাঠিয়েছিলাম। কখন থেকে ট্রেনটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার যাবে সেটা রেল ভবন সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদেরকে জানাবে। এরমধ্যে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে গেছেন। আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যখনই নিদের্শনা আসবে আমরা সেই অনুযায়ী ট্রেন চালাবো। আন্তঃনগর ট্রেনটিতে কেবিন, এসি চেয়ার, শোভন চেয়ার সব আছে বলে জানান সহকারী সিওপিএস আবু বকর সিদ্দিক।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে চলাচলরত মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ৩২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গেলে আরও ১৫২ কিলোমিটার পথ যুক্ত হবে। ফলে মোট দূরত্ব দাঁড়াবে ৪৭২ কিলোমিটার। তবে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভাড়া সাধারণ আন্তঃনগর ট্রেনের মতোই থাকবে, কারণ ট্রেনটি বিরতিহীন নয়। কিন্তু চট্টগ্রাম–কক্সবাজার–চট্টগ্রাম অংশে ট্রেনটি বিরতিহীনভাবে চলবে। ফলে ওই অংশের ভাড়া বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ এর মতোই হবে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের একটি সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজার রেলপথ চালুর পর পাহাড়–সমুদ্রের শহর কক্সবাজারে প্রথম ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ যাত্রা শুরু করে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর। সেদিন ১ হাজার ১০ জন যাত্রী ট্রেনে প্রথমবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার যান। এরপর থেকে আর কখনও ওই ট্রেনের কোনো আসন ফাঁকা যায়নি। যাত্রীদের এমন চাহিদার কথা বিবেচনা করে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ নামে আরও একটি নতুন ট্রেন চালু করা হয়। তাতেও যাত্রী চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম থেকে প্রবাল ও সৈকত এক্সপ্রেস নামে আরও দুটি ট্রেন চলাচল শুরু করে। বর্তমানে ঢাকা থেকে দুটি এবং শুধুমাত্র চট্টগ্রাম থেকে দুটি ট্রেন কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে। যাত্রীবাহী এই আন্তঃনগর ট্রেনটি গত ৪০ বছর ধরে চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটে চলাচল করছে। দুই বছর আগে ট্রেনটির রেকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা আধুনিক রেক সিস্টেমের নতুন কোচ যুক্ত করা হয়েছে।
মহানগর এক্সপ্রেসের সূচি অনুযায়ী, বর্তমানে ট্রেনটি ঢাকা থেকে রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসে এবং ভোর সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রামে স্টেশনে পৌঁছায়। আবার বেলা সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে মহানগর এক্সপ্রেস (৭২১) সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় এসে পৌঁছায়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল শুরু হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসার পর ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে রাত ৩টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। এরপর টানা তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে পৌঁছাবে। আবার সেখানে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বিরতির পর সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কক্সবাজার স্টেশন থেকে ছেড়ে আসবে। তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে। এবং চট্টগ্রামে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে আগের মতোই দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। ট্রেনটির মোট আসন সংখ্যা রাতে ৭০৬টি এবং দিনে ৭৩৬টি। ট্রেনটিতে এসি বার্থ (শুধু রাতে), স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) এবং শোভন চেয়ার শ্রেণির আসন রয়েছে। ফলে এই ট্রেনে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী আসন নিয়ে যাতায়াত করতে পারছেন।












