‘চলে আসুন ষোলশহর’যে ফেসবুক পোস্ট চট্টগ্রামের আন্দোলনে নতুন গতি এনেছিল

| বুধবার , ৫ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলে ফেসবুকে মাত্র তিনটি শব্দের একটি পোস্ট– ‘চলে আসুন ষোলশহর’। সংক্ষিপ্ত এই আহ্বানই পরবর্তীতে চট্টগ্রামের আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় প্রতীক হয়ে ওঠে। পোস্টটি করেছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা মো. ওয়াসিম আকরাম। ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনে যোগ দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুরাদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ওয়াসিম। তার মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী, সহযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জোরালো হতে থাকে। আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হামলার পরও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমেনি। বরং প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিলেন। খবর বাসসের।

এ সময় ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় তথ্য আদানপ্রদান কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছোট ছোট বার্তাই আন্দোলনকারীদের সংগঠিত হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিকেল ৩টার দিকে ওয়াসিম আকরামের দেওয়া ‘চলে আসুন ষোলশহর’ পোস্টটিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই নির্ধারিত স্থানে যেতে শুরু করেন। সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্ট দেওয়ার পর ওয়াসিম নিজেও আন্দোলনের মাঠে মিছিলে যোগ দেন। তবে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রথমে ষোলশহর এলাকায় অবস্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরে আন্দোলনকারীরা মুরাদপুরের দিকে চলে যান। সেখানে সংঘর্ষ শুরু হলে একপর্যায়ে ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হন। তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই ওয়াসিম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আরেকটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আমার প্রাণের সংগঠন, আমি এই পরিচয়ে শহিদ হব।’ তার এই পোস্টও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ১৬ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে তাদের প্রথম পরিকল্পনা ছিল ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় জড়ো হওয়ার। কিন্তু সেখানে সশস্ত্র অবস্থান থাকায় তারা মুরাদপুরের দিকে যান। সেখানেও সংঘর্ষের মুখে পড়তে হয়। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগযুবলীগের সদস্যরা একযোগে হামলা চালায়। আত্মরক্ষার জন্য আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। এ সময় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কাছে ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হন। নোমান জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও ওয়াসিমের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। ওয়াসিম তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি শিক্ষা বোর্ড এলাকার কাছে অবস্থান করছেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত মিছিলের মূল অবস্থানে যোগ দেবেন। সেটিই ছিল তাদের শেষ কথা।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন শাহেদ বলেন, ওয়াসিম তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সংঘর্ষের সময় তারা শিক্ষা বোর্ড ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেন। পরে সেখান থেকে বের হওয়ার সময় ওয়াসিম পেছনে থেকে অন্যদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল।

সালাউদ্দিন শাহেদ জানান, ওয়াসিম হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলারও সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে এবং তিনি সেখানে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ওয়াসিমের মৃত্যুর পর চট্টগ্রামজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরদিন থেকে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, তরুণতরুণী এবং সাধারণ মানুষ আরও ব্যাপকভাবে আন্দোলনে অংশ নেন। আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে মুরাদপুর, ষোলশহর, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা। পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াসিমের মৃত্যু চট্টগ্রামের আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয় এবং পরবর্তী সময়ের গণআন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে। হত্যা মামলার বিষয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ওয়াসিমের মা জোছনা বেগম পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।

পরে জুলাইআগস্ট আন্দোলনে ওয়াসিমসহ ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক মামলা হয়। তদন্ত শেষে ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালএ বিচারাধীন রয়েছে। পাঁচলাইশ থানা সূত্র জানিয়েছে, হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

কঙবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা বাজারপাড়ার বাসিন্দা ওয়াসিম আকরাম পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তিনি শুধু আন্দোলনের কর্মীই নন, পড়াশোনাতেও ছিলেন মেধাবী। চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। তবে সেই ফল প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক প্রতিক্রিয়ায় ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তার ছেলেসহ অনেক তরুণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তার সন্তানের হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং জীবদ্দশায় সেই বিচার দেখে যেতে পারবেন।

দুই বছর পরও ‘চলে আসুন ষোলশহর’ এই তিনটি শব্দ চট্টগ্রামের আন্দোলনের স্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের কাছে এটি শুধু একটি ফেসবুক পোস্ট নয়, বরং একটি সময়ের সাহস, প্রতিরোধ এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২৫টি ওয়ার্ড থেকে বিনামূল্যে বর্জ্য সংগ্রহ করবে চসিক
পরবর্তী নিবন্ধজনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী