প্রকৃতি হলো পৃথিবীর সকল প্রাকৃতিক বস্তু ও জীবের সমষ্টি, যা জীবজগতের অস্তিত্ব ও ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর কণা, পাহাড় নদী, বৃক্ষ, তরুলতা, বনজঙ্গল, এমনকী বৃহৎ থেকে বৃহত্তর চন্দ্র–সূর্য, গ্রহ–নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ড; সব মিলে প্রকৃতি। প্রকৃতির মূল উপাদান হলো আল্লাহর নূর। এই নুর হলো স্বয়ং রসূলেপাক হজরত আহমদ মোজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.), যিনি সৃষ্টির আদিতে আহমদ রূপে ছিলেন। অর্থাৎ–জ্ঞানশক্তি, যেটি আধ্যাত্মিক শক্তি। নুর থেকে সমগ্র প্রকৃতির বিকাশ বলে রসুলেপাক (দ.)-এঁর একটি নাম উম্মিউন। অর্থাৎ তিনি সৃষ্টির মূল। রসূলেপাক (দ.) বলেছেন, “আমি আল্লাহর নুর থেকে, সমগ্র সৃষ্টি আমার নুর থেকে সৃজিত হয়েছে”। নুর থেকে সৃষ্ট বলে সমগ্র প্রকৃতিই পবিত্র। নূর থেকে পঞ্চতত্ত্ব (অর্থাৎ–আকাশ, বায়ু, পানি অগ্নি, মাটি) সৃষ্টি হয়েছে। মূলশক্তি থেকে পাঁচ উপাদান সৃষ্ট,তাই একে পঞ্চশক্তি বলে। প্রকৃতিতে লুকিয়ে আছে আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য। প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর নেয়ামত। এতে রয়েছে আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন। এজন্য পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ বারবার বলেছেন, “আমার কোন কোন নেয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে”? প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। সমগ্র প্রকৃতি আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন এবং তাঁর গুণাবলি, ইচ্ছা ও ক্ষমতার প্রকাশ। প্রকৃতি মানে আল্লাহ নয়; বরং আল্লাহর নিদর্শন। একজন আরিফবান্দা যখন প্রকৃতিকে দেখেন, তখন সৃষ্টিকে উপাস্য মনে করে না; বরং সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টার কুদরত, জ্ঞান, সৌন্দর্য ও রহমত উপলব্ধি করেন।
হজরত ইমাম গাজ্জালী (র.) ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ কিতাব–এ বলেন,“জ্ঞানী ব্যক্তি যখন আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, প্রাণী এবং মানুষের সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন, তখন তাঁর অন্তরে আল্লাহর মহিমা, প্রজ্ঞা ও কুদরত স্পষ্ট হয়ে ওঠে”।
তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ সৃষ্টির ঊর্ধ্বে। প্রকৃতির প্রতিটি বস্তু আল্লাহর অস্তিত্ব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে”। প্রতিটি সৃষ্টিই প্রতিনিয়ত আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকে। প্রকৃতি আল্লাহর এবাদতে লিপ্ত থাকে। এজন্য প্রকৃতির প্রাণ বৃক্ষ কীভাবে এবাদত করে তা থেকে মানুষকে শিক্ষা নিতে ইসলাম ধর্মে নির্দেশনা দিয়েছেন। সৃষ্টির রহস্য নিয়ে চিন্তা করতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জ্ঞানীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। বলেছেন, “নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত–দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে বিশেষ নিদর্শন” (সূরা –আল ইমরান)। প্রকৃতি জুড়ে রয়েছে আল্লাহর অস্তিত্ব। প্রকৃতির প্রতিটি কণাই আল্লাহর একত্ববাদের নিদর্শন। প্রতিটি কণাতে রয়েছে আল্লাহর জ্ঞান ও গুণের বিকাশ। প্রকৃতি হল উপলব্ধির উৎকৃষ্ট মাধ্যম। অলি–আউলিয়া, মুনি –ঋষিগণ প্রকৃতির মধ্যে নিমগ্ন থেকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেন এবং প্রকৃতির প্রতিটি কণায় কণায় আল্লাহকে উপলব্ধি করেন। প্রকৃতিতে স্রষ্টাকে উপলব্ধি করে হজরত শেখ সাদী (র.) বলেছেন, “যেদিন জ্ঞানচক্ষু ফুটবে সেদিন বৃক্কের প্রতিটি পাতায় পাতায় আল্লাহর অনুভূতি জাগবে”।
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি কণা আল্লাহর অসীম কুদরত, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের এক একটি নিদর্শন। ক্ষুদ্রতম সৃষ্টিতেও এমন বিস্ময় আছে, যা চিন্তা করলে আল্লাহর বিশালতা উপলব্ধি করা যায়। মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রখ্যাত অলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক (ক.) মাইজভান্ডারী বলেছেন, “সৃষ্টির রহস্য নিয়ে চিন্তা করাও এক প্রকার ইবাদত”। এজন্য সাধকদের দেখা যায়–তাঁরা কখনো নদী সাগর, কখনো পাহাড়, বনজঙ্গলের সংস্পর্শে নীরবে চলে যায়, কখনো চন্দ্র সূর্য, গ্রহ–নক্ষত্র তথা মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকেন এবং ভাবেন আল্লাহ সৃষ্টি রহস্য এত বিশাল রহস্যময় হলে, না জানি আল্লাহ কতই মহান, অসীম ও রহস্যময়। প্রকৃতি আল্লাহর অস্তিত্ব, অসিমত্ত্ব, বিশালতা ও সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে গভীর চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। মুনি–ঋষি, আউলিয়াদের দেখা যায়–প্রকৃতির পঞ্চতত্ত্বে ডুবে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করতেন। তাঁরা প্রকৃতির উপাদান পানি তথা নদী সাগর, পাহাড় বন জঙ্গল, বায়ু আকাশ, বৃক্ষ, সমগ্র প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন সহ প্রকৃতির প্রতিটি কণায় কণায় আল্লাহকে খুঁজে বেড়ায়। সর্বোপরি প্রাকৃতিক জ্ঞান অর্জন করে প্রকৃতির মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে নৈকট্য লাভ করেন। এজন্য প্রাচীন মনীষীগণ প্রকৃতিকে আল্লাহর ‘খোলা কিতাব’ মনে করতেন। প্রকৃতির সংস্পর্শ মানুষকে পজেটিভ ভাইব্রেশন দেয়। আত্মার প্রশান্তি আনে।
প্রকৃতির উপাদান পানির সংস্পর্শ অহংকার মুক্ত করে, মনকে শীতল ও বিনয়ী করে। গাউসুল আজম হজরত সৈয়দ গোলামুর রহমান শাহ(ক.) মাইজভাণ্ডারী প্রায়সময়ই হাতে পানি ঢালতেন। মতিভাণ্ডার দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব গাউসেভাণ্ডার হজরত শাহ্সুফি মওলানা মতিয়র রহমান শাহ্ (ক.) ফরহাদাবাদী (শাহ্সাহেব কেবলা) এবং শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক (ক.) মাইজভাণ্ডারী প্রায়সময় পানিতে ডুবে থাকতেন। পানির সংস্পর্শ সাধককে নমনীয় করে। পানি শুধু দেহকে নয় বরং মনকেও পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। পানির সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক, পানির সাথে হজরত খিজির (আ.)-এঁর সম্পর্ক। এজন্য পানি জ্ঞানকে বৃদ্ধি করে। ইসলাম ধর্মে পানি দ্বারা অযুর বিধান রয়েছে। অযু দ্বারা দেহ ও মন পবিত্র হয়। পানি দেহ ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। পানি এক প্রকার শক্তি। পানিতে বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে বলেই মুনি ঋষি, আউলিয়াগণ পানিতে ডুবে থাকতেন। এটি জ্ঞানের জগতে সাধককে উর্ধ্বমুখী করে। একইভাবে পাহাড় শান্ততার প্রতীক। পাহাড় প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বন, নদী, মেঘ ও পাহাড় একত্রে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে। পাহাড় পৃথিবীকে ভূমিকম্প থেকে রক্ষা করে। পাহাড়ের মধ্যে বিশেষ আত্মিক ভাইব্রেশন কাজ করে। স্বয়ং রসূলে পাক (দ.) বহু বছর হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন। ওখানে তাঁর নিকট অনেক ওহীও এসেছিল।
পবিত্র কোরআন শরীফে পাহাড়ের অনেক গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে। পাহাড় স্থিরতা, শক্তি ও দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রতীক। মানুষের চরিত্রও যেন পাহাড়ের মতো দৃঢ় ও অবিচল হয়–এই আদর্শ সেখানে প্রকাশ পায়। পাহাড় সে শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। পাহাড় মনকে স্থিরতা প্রদান করে। উপনিষদে পাহাড়কে মূলত আধ্যাত্মিকতার প্রতীকরূপে দেখা হয়েছে। পাহাড় ঝড়–বৃষ্টি সহ্য করেও অটল থাকে, তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ–দুঃখে বিচলিত হয় না। এই তুলনা আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের আদর্শকে প্রকাশ করে। আবার বৃক্ষকে বলা হয় প্রকৃতির প্রাণ। বৃক্ষের সাথে মানুষের প্রাণের সম্পর্ক। বৃক্ষের মাধ্যমে মাটি ও পানির সংযুক্ত স্থাপন হয়। সাধকদেরকে দেখা যায় বেশিরভাগ সময় বৃক্ষের নিচে বসে থাকতে। বাবা ভাণ্ডারী (ক.) সহ অনেক সাধকই বৃক্ষের নিচে (বটবৃক্ষ) বসে থাকতেন। হজরত গাউসুলআজম বাবাভাণ্ডারী (ক.) পাহাড়, বন জঙ্গলে অনেক দিন সাধনা করে প্রকৃতির মালিককে হাসিল করেন।
আমরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতির রস আস্বাদন করে যাচ্ছি। আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করে যাচ্ছি। হযরত শেখ সাদী (র.) গুলিস্তান কিতাবে লিখেছেন, “মেঘ, বায়ু চাঁদ, সূর্য, তোমার সেবায় নিয়োজিত; তাই কৃতজ্ঞ হও”। কিন্তু সেই নেয়ামতের রক্ষণাবেক্ষণ ও শুকরিয়া আদায় না করে অবদানকে অস্বীকার করছি। প্রকৃতির ঋণকে অস্বীকার করা মানে আল্লাহর নেয়ামত মহিমাকে অস্বীকার করা। প্রকৃতি মাতৃদুগ্ধের মত পবিত্র। মাতৃদুগ্ধের মত প্রকৃতির ঋণও পরিশোধযোগ্য নয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক। সাজ্জাদানশীন, মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ












