ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে সমপ্রতি কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, তাদের (যারা মারা গেছে) এনএস–ওয়ান পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী–তারা অন্য রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যার উপসর্গ অনেকাংশেই ডেঙ্গুর মতো। এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি গতকাল সোমবার টাইগারপাসস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কার্যালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি, ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের কার্যক্রম বিষয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। সভায় মেয়র ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোতোয়ালী, বায়েজিদ, বন্দর, বাকলিয়া, হালিশহর, পাহাড়তলী, আকবর শাহ, সদরঘাট, ডবলমুরিং, খুলশী, পতেঙ্গা,
চান্দগাঁও, ইপিজেড, আগ্রাবাদ ও চকবাজার এলাকাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনতে হবে উল্লেখ করে বলেন, এসব এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে চসিকের কাছে আধুনিক ছয়টি বিশেষ স্প্রে মেশিন রয়েছে। তবে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে জরুরি ভিত্তিতে আরও ১০টি স্প্রে মেশিন সংগ্রহের নির্দেশ দেন তিনি। ভবিষ্যতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৪১টি স্প্রে মেশিন সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও জানান মেয়র।
ডা. শাহাদাত বলেন, বর্ষা মৌসুমে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাই আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসকে সামনে রেখে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের শিথিলতার সুযোগ নেই। নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মশক নিধন কার্যক্রম আরও গতিশীল, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে।
মেয়র বলেন, আল্লাহর রহমতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সীমানাভুক্ত এলাকায় বসবাসরতদের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার শূন্য রয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। জুলাই মাস শেষে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৩৮ জন। আগস্টের প্রথম কয়েক দিনে আরও ১৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫৬ জন। এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন টানা বৃষ্টি হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। টানা বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি ধুয়ে যায়, ফলে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে না। কিন্তু একদিন বৃষ্টি হয়ে দুই–তিন দিন পানি জমে থাকলে সেটিই ডেঙ্গু বিস্তারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তাই নগরীর প্রতিটি এলাকায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানি দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
ডা. শাহাদাত বলেন, বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বীকৃত কার্যকর লার্ভিসাইড ও বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। যেখানে এডিস মশার প্রজননের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিত্যক্ত বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, খালি প্লট ও যেসব স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে সেসব জায়গা নিয়মিত পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়ে মেয়র বলেন, প্রয়োজন হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্পৃক্ত করে বাড়ির ছাদ ও পরিত্যক্ত স্থানে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো অবহেলার সুযোগ নেই।
সভায় ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন মেয়র। সভায় জানানো হয় গতকাল সোমবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৭৯৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬০টি অভিযোগের সমাধান হয়েছে এবং ৬৩৯টি অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মশা সংক্রান্ত ৪১টি অভিযোগের মধ্যে ৩৬টির সমাধান করা হয়েছে।
মেয়র নির্দেশ দেন, ওয়ার্ড সীমানা নিয়ে কোনো অভিযোগ যেন বাতিল না করা হয়। যদি কোনো অভিযোগ অন্য ওয়ার্ডের আওতায় পড়ে, তবে তা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে ফরওয়ার্ড করে সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন। নগরবাসী যাতে পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, রাস্তা, ড্রেন, আলোকায়নসহ যেকোনো নাগরিক সেবা সহজে এই অ্যাপের মাধ্যমে পেতে পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
দুটি বিশেষ টিম গঠন : সভায় নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের নির্দেশ দেন মেয়র। তিনি বলেন, হাটহাজারী রোড থেকে অঙিজেন, লালখান বাজার, রেডিসন ব্লু, এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত সম্ভাব্য ভিআইপি রুটে কোথাও যেন খানাখন্দ, ভাঙা ম্যানহোল, নষ্ট স্টিল স্ট্রাকচার, অপরিচ্ছন্নতা বা আলোকস্বল্পতা না থাকে।
এ লক্ষ্যে সভায় রোড সুপারভাইজারদের দুইটি বিশেষ টিম গঠনের নির্দেশ দেন মেয়র। একটি দল হাটহাজারী থেকে লালখান বাজার হয়ে রেডিসন ব্লু পর্যন্ত এবং অন্য দল রেডিসন ব্লু থেকে এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত সম্ভাব্য রুট পরিদর্শন করবে। টিমগুলোকে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়ে মেয়র বলেন, কোথায় মিডিয়ান আইল্যান্ডে ফুলের টব বসানো যাবে, কোথায় নতুন গাছ লাগানো প্রয়োজন, কোথায় রং করতে হবে, কোথায় সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড স্থাপন করা যাবে–এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিতে হবে। তিনি নগর সৌন্দর্যবর্ধনে গাছ, ফুল, আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশবান্ধব বার্তা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ‘গ্রিন, হেলদি, সেফ অ্যান্ড স্মার্ট চট্টগ্রাম’ স্লোগানকে সামনে রেখে নগরজুড়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, যারা নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকতে হবে। শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নই হবে মূল বিষয়। জনগণ যেন পরিবর্তন চোখে দেখতে পারে, সেভাবেই কাজ করতে হবে।
সভায় বক্তব্য রাখেন চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি।












