ডলু নদীর সুখ-দুঃখের উপাখ্যান

মোয়াজ্জেম হোসেন | রবিবার , ২ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

পার্বত্য জেলা বান্দরবান থেকে প্রবাহিত হয়ে ডলু নদী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির নারিশ্চাপানত্রিশা, পুটিবিলা, হাফেজপাড়া, আধুনগর ইউনিয়ন, লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে সাতকানিয়া উপজেলার গারাংগিয়া, সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সাতকানিয়া সদর, পৌরসভা, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, গাঠিয়াডেঙ্গা, নলুয়া, আমিলাইশ ইউনিয়ন হয়ে সাঙ্গু নদীতে পতিত হয়েছে। ডলু নদী যতই মোহনার দিকে অগ্রসর হয়েছে, ততই বড় হয়েছে। কারণ, টঙ্কাবতী ও হাতিয়া খালসহ অনেক ছোট ছোট খাল ডলুর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ডলুর দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৪৬ মিটার। নদীর প্রকৃতি সর্পাকার।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির তাঁর ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ (২০০৪) গ্রন্থের মাধ্যমে ডলু নদীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি এনে দিয়েছেন। একসময় যে ডলু নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এবং যে নদী ছিল সাতকানিয়া, লোহাগাড়াবাসীর জীবন ও জীবিকার উৎস, আজ সে নদী প্রাকৃতিক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও ডলু ছিল প্রধান নৌরুট। একসময় এই নৌপথে মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, বাগদাদ ও জজিরাতুল আরব থেকে আধ্যাত্মিক সাধক ও ধর্মপ্রচারকেরা ইসলামের সুমহান বাণী নিয়ে সাতকানিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তন্মধ্যে অন্যতম শায়খ শাহ শরফুদ্দিন, মোহাম্মদ ইউসুফ প্রকাশ শাহপীর, শাহ ওমর, মক্কী শাহ, দৌলত শাহ, কুতুব শাহ, মাওলানা শাহ মোহাম্মদ ছগীর, ইয়াছিন মক্কী ও সৈয়দ সাদেকসহ অনেক সাধকপুরুষ।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ডলুই ছিল সাতকানিয়া, লোহাগাড়াবাসীর যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সাতকানিয়ার মানুষ ডলু নদী দিয়ে প্রতিদিন নৌকাযোগে চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত করতেন, পণ্য পরিবহনও করতেন। এ নদীটি আন্তর্জাতিক নৌরুটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে পাকিস্তানের করাচি, ভারতের কলকাতা ও মায়ানমারের রেঙ্গুন ও আকিয়াব থেকে সেলাই করা ও থান কাপড়, কাঠ এবং অন্যান্য পণ্য নৌকাযোগে সাতকানিয়ায় আসত ডলু নদী হয়ে।

সাতকানিয়ার সেই আন্তর্জাতিক নৌরুট ডলু নদী এখন জৌলুস হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন নদীতে জমেছে পলিমাটির স্তূপ। সেখানে চলছে ধান, আখ ও সবজি চাষ। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় ঝুঁকিতে থাকে পৌর শহরের রক্ষাবাঁধ।

বান্দরবানের পাহাড়ি ঢলের কারণে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালীসহ বিস্তীর্ণ জনপদ ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়। তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট ও জনপদ। প্রতিবছর অসংখ্য কৃষিজমি, ফসল ও মানুষের বসতবাড়ি বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষজ্ঞ মহল থেকে জানা যায়, ডলু নদী আন্তর্জাতিক নৌরুটের অন্তর্ভুক্ত থাকায় ব্রিটিশ আমল থেকে নদীতে বাঁধ ও বেড়া দেওয়া যাবে না এমন একটি সরকারি নিয়ম প্রচলিত ছিল। সে সময় পাকিস্তানের করাচি ও ভারতের কলকাতা থেকে ডলু নদী হয়ে ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকাযোগে তৈরি পোশাক ও থান কাপড় সাতকানিয়ায় আনা হতো। পরে কাপড়গুলো বর্তমান লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের এম চরহাট (ফকিরহাট) এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। পুটিবিলায় ছিল পোশাক তৈরির শিল্প। সেখানে এখনও জোলাপাড়া নামে একটি পাড়া আছে।

ডলু নদীর দুই পাড়ে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছিল সুতা কাটার চরকা শিল্প। চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ থেকে গদি নৌকাযোগে বড় জট বাঁধানো সুতার লট নিয়ে আসা হতো। এসব জট বাঁধানো সুতা থেকে চরকার সাহায্যে তৈরি হতো বিভিন্ন মানের সুতা। সুতার বান্ডিলগুলো নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো কাপড় তৈরি এবং মাছ ধরার জাল তৈরির জন্য। আধুনিক পাওয়ারলুম ও গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারের ফলে হাতে সুতা কাটার প্রচলন কমে যায়। সাতকানিয়ায় ডলু নদীর তীরবর্তী সুতার চরকা শিল্প বর্তমানে বিলুপ্ত হলেও এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে সামিয়ারপাড়ার সুতার চরকা শিল্প বা তাঁতশিল্প। সাতকানিয়ার সোনাকানিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো জোলাপাড়া বা তাঁতীপাড়া আছে, যেখানে কাপড় তৈরি হতো। এসব কাপড় নদীপথে দেশের বিভিন্ন শহর ও বন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো। এছাড়াও সাতকানিয়ার প্রতিটি গ্রামের ঘরে ঘরে জাল বোনা হতো। তাঁতশিল্প ছাড়াও সাতকানিয়ালোহাগাড়ায় বেশ কিছু ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প গড়ে ওঠে।

একসময় সাঙ্গু মোহনার কাছাকাছি ডলু নদীর আমিলাইশ অংশে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। ডলু নদীর তীরের রামপুর জেলেপাড়াসহ অনেকে সারা বছর ডলু নদী ও অন্যান্য জলাশয়ে মাছ ধরে এবং নৌকা বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। শৈশবে আমিলাইশে মামার বাড়িতে ডলু নদীর অনেক চিংড়ি ও চিড়িং মাছ খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ডলু নদীতে পাহাড়ি এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা ভাসিয়ে নিয়ে আসত বিভিন্ন প্রকার কাঠ ও দীর্ঘ সারি সারি বাঁশের চালি। নদীর দুই তীরে ফলে নানারকম সবজ্তিবাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, মুলা, বেগুন। তীরে মাইলের পর মাইল হয় আখের চাষ।

যে নদীতে নানান রঙের নৌকা ভাসত, সে নদী এখন শুধু বালুর চর। যখন রাস্তাঘাট ও স্থলপথে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত ছিল না, তখন নৌপথে নৌকায় মাইকে গান বাজিয়ে, গান গেয়ে বরযাত্রীর যাতায়াত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। আমারও সুযোগ হয়েছে নৌকায় চড়ে বরযাত্রী হয়ে বিয়েতে অংশ নেওয়ার। আমি ডলু নদীর পাশের মানুষ না হলেও কাছের মানুষ। প্রমত্ত বর্ষায় ডলু নদীর ভাঙনে আমাদের গ্রাম ও বাড়ি পানিতে ডুবে, রাস্তাঘাট, পুকুর ও জলাশয় ডুবে। মানুষের দুঃখদুর্দশা বাড়ে। অনেক মানুষ নদীভাঙনে বাস্তুভিটা ও ঘরবাড়ি হারায়, ফসল হারায়, গবাদিপশু হারায়।

ডলু নদীর বালি চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণে উৎকৃষ্ট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডলুর বালির চাহিদা বাড়তে থাকে। সরকার থেকে কম দামে ইজারা নিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বিচারে বালি উত্তোলন শুরু হয়। বালু উত্তোলনে প্রয়োগ করা হয় যান্ত্রিক পদ্ধতি। ডলুর বুকে নামানো হয় শত শত বড় ও ভারী পাম্প মেশিন। এই দানবীয় মেশিনগুলো বালিমাটিসহ এমনকি অস্থিমজ্জাগত খুবলে খেয়ে ফেলে। ক্ষেত্রবিশেষে কোথাও গভীর খাদের সৃষ্টি করে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। অতি বর্ষণে পাড় ও বাঁধে ফাটল সৃষ্টি হয়ে নদীর পাড় ও বাঁধ ভেঙে যায়। ডলুতে এখন বালির চেয়ে মাটি বেশি, তাও ময়লা ও আবর্জনায় ভরা। তাই শুধু বালি নয়, কর্দমাক্ত মাটিও ইজারার ব্যবস্থা করলে নাব্যতা সৃষ্টিতে সুফল বয়ে আনবে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের, বিশেষ করে সাতকানিয়ালোহাগাড়ার এই ভয়াবহ দুর্যোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন। নদীভাঙন রোধ করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। ডলু নদী, টঙ্কাবতী নদীসহ সংযুক্ত খালের নাব্যতা সৃষ্টিতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় নদী ও খাল খনন। টেকসই বেড়িবাঁধ ও শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ। অপরিকল্পিত বালি ও মাটি উত্তোলন বন্ধ করা। চট্টগ্রামকক্সবাজার রেললাইনে প্রয়োজনমতো কালভার্ট নির্মাণ। এছাড়াও খাল ও নালাসমূহ নিয়মিত পানি চলাচল উপযোগী করে খনন করা।

প্রতিবছর প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে দুর্যোগে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সরকারি উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজন।

ডলু নদীতে আবার নিয়মিত জোয়ারভাটা আসুক, সারা বছর নিয়মিত নৌকা চলুক। নদীপাড়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসুক। ডলু নদী শুধু দুর্যোগ, দুর্ভোগ ও বিপদের কারণ না হয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশের আসল রূপ, রস, গন্ধ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে ফিরে আসুক।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ