লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতির ইঙ্গিত

প্রস্তাবিত নকশা, প্রযুক্তিগত কাঠামো, পরিচালনার প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশ এপিএম টার্মিনালসের

হাসান আকবর | রবিবার , ২ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আলোচিত লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বন্দর অপারেটর এপিএম টার্মিনালস। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো প্রকল্পটির প্রস্তাবিত নকশা, প্রযুক্তিগত কাঠামো এবং পরিচালনার প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে চলতি বছরের শেষ দিকে নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনাও পুনর্ব্যক্ত করেছে। টার্মিনালটি জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং কম কার্বন নিঃসরণ পদ্ধতিতে গ্রিন পোর্ট হিসেবে পরিচালিত হবে বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় সাড়ে ৫শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে নির্মিতব্য এই টার্মিনালটি হবে বাংলাদেশের প্রথম শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা প্রথম কোনো কন্টেনার টার্মিনাল। নির্মাণ শেষ হলে বছরে ৮ লাখ টিইইউএসের বেশি কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হবে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কন্টেনার পরিচালনা সক্ষমতা প্রায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন টার্মিনালটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার কন্টেনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সাধারণত প্রায় ২ হাজার ৭০০ টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। ফলে বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ার সুযোগ সৃষ্টি হলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

প্রকাশিত নকশা অনুযায়ী, টার্মিনালে ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটবিশিষ্ট ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটি নির্মাণ করা হবে। সেখানে থাকবে সাতটি শিপটুশোর ক্রেন, ৩২টি বিদ্যুৎচালিত রাবার টায়ার গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি বিদ্যুৎচালিত টার্মিনাল ট্রাক্টর। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত কন্টেনার ওঠানামা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এপিএম টার্মিনালস সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের প্রাথমিক নকশা পরিকল্পনা পর্যায়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল। বর্তমানে তা আরো পরিমার্জন ও চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও ছাড়পত্র পাওয়া গেলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে নির্মাণকাজ শুরু করবে এপিএম। ঠিকাদার নির্বাচনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় সম্পন্ন হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ আমদানি ও রপ্তানি পণ্য ছোট ফিডার জাহাজে করে প্রথমে কলম্বো, সিঙ্গাপুর বা অন্যান্য আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে বড় মেইনলাইন জাহাজে বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ৭ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

এপিএম টার্মিনালসের মতে, নতুন টার্মিনাল চালু হলে বড় মেইনলাইন কন্টেনার জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভিড়তে পারবে। ফলে ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর নির্ভরতা কমবে, পণ্য পরিবহনের সময় হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যয় কমে আসবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা বয়ে আনবে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কম লিড টাইম গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ওষুধ, চামড়া, পাদুকাসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সুবিধা পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটির অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে এ ধরনের বৃহৎ বিনিয়োগ সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এতে দেশের সমুদ্রবন্দরভিত্তিক লজিস্টিকস অবকাঠামো আরো শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উল্লেখ্য, সরকারিবেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিতে গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করে এপিএম টার্মিনালস বিভি। ওই চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনালের নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬০টির বেশি বন্দর ও কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে এপিএম টার্মিনালস।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবান্দরবানে হামে আক্রান্ত দুই শিশু জানেনা তাদের মা আর নেই
পরবর্তী নিবন্ধগ্যাসের দাম বাড়ছে? পেট্রোবাংলা বলছে পরিকল্পনা নেই