বিশ্বসাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেননি, সাংবাদিকতার ভাষাও বদলে দিয়েছেন। ইতালীয় সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি সেই বিরল কয়েকজনের একজন। তিনি সাক্ষাৎকারকে কখনোই প্রশ্নোত্তরের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সত্য অনুসন্ধানের এক কঠিন মুখোমুখি লড়াই হিসেবে। রাষ্ট্রপ্রধান, বিপ্লবী নেতা, স্বৈরশাসক কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব–ক্ষমতার যে স্তরেই কেউ থাকুন না কেন, তাঁর সামনে বসে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে ফালাচি কখনো দ্বিধা করেননি। এই নির্ভীকতাই তাঁকে বিংশ শতকের সবচেয়ে আলোচিত সাংবাদিকদের একজন করে তুলেছে।
১৯২৯ সালের ২৯ জুন ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্ম নেওয়া ফালাচির শৈশব কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে। তাঁর বাবা ছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। কৈশোরেই তিনি ইতালীয় প্রতিরোধ আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হন। যুদ্ধ, দমন–পীড়ন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার এই বাস্তবতা তাঁর চিন্তা ও সাংবাদিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী জীবনে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি কিংবা ক্ষমতার প্রতি তাঁর আপসহীন অবস্থানের পেছনে এই অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট।
সাংবাদিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ইতালির সাময়িকী L‘Europeo–তে। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি কেবল ইতালির নন, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের নানা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে প্রতিবেদন করেছেন। যুদ্ধের পরিসংখ্যান নয়, সেই যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়া মানুষের জীবন ছিল তাঁর লেখার অন্যতম কেন্দ্র। ফলে তাঁর প্রতিবেদন শুধু তথ্য দিত না, পাঠককে ঘটনাস্থলের মানবিক বাস্তবতার মুখোমুখিও দাঁড় করাত।
তবে ফালাচিকে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করেছে তাঁর সাক্ষাৎকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাবান মানুষের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা নয়; বরং তাঁদের কথার অসঙ্গতি, দ্বিধা কিংবা গোপন অবস্থানকে প্রশ্নের মাধ্যমে উন্মোচন করা। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোল্ডা মেয়ার, ইয়াসির আরাফাত, হেনরি কিসিঞ্জার, জুলফিকার আলী ভুট্টো, ইন্দিরা গান্ধী, দেং শিয়াওপিং, আয়াতুল্লাহ খোমেনিসহ বিংশ শতকের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের। এই সাক্ষাৎকারগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল প্রস্তুতি। একটি সাক্ষাৎকারের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তাঁর রাজনীতি, বক্তব্য ও ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণা করতেন। ফলে প্রশ্নগুলো কখনোই সাধারণ থাকত না। অনেক সময় সাক্ষাৎকারদাতারা বিরক্ত হতেন, ক্ষুব্ধ হতেন, এমনকি সাক্ষাৎকার মাঝপথে বন্ধ করার পরিস্থিতিও তৈরি হতো। কিন্তু ফালাচি বিশ্বাস করতেন, অস্বস্ত্তিকর প্রশ্ন না করলে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরও পাওয়া যায় না।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত সাক্ষাৎকারগুলোর একটি ১৯৭৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে। সাক্ষাৎকারের সময় নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক চাদর পরতে হয়েছিল তাঁকে। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি খোমেনিকে প্রশ্ন করেন, কেন নারীদের এই পোশাক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সাক্ষাৎকার শেষে তিনি প্রকাশ্যেই চাদর খুলে ফেলেন। ঘটনাটি যেমন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, তেমনি ফালাচির সাংবাদিকসত্তার একটি প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেও ইতিহাসে স্থান পায়। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল শুধু প্রশ্ন করা নয়, প্রয়োজনে অবস্থানও প্রকাশ করা। তবে এই অবস্থান তাঁকে বিতর্কের বাইরেও রাখেনি। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ইসলাম ও অভিবাসন নিয়ে তাঁর লেখা বই ও নিবন্ধগুলো ব্যাপক সমালোচিত হয়। অনেকে মনে করেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখায় আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণী ভারসাম্যকে ছাপিয়ে যায়। আবার অন্যদের মতে, তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে আপস করেননি। এই বিতর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় সাংবাদিকরাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের কাজের মূল্যায়নও সময়ের সঙ্গে নতুন করে হয়। ফালাচির লেখার আরেকটি বড় শক্তি ছিল ভাষা। তিনি নিছক তথ্য পরিবেশন করতেন না; ঘটনাকে সাহিত্যিক সংবেদনশীলতায় তুলে ধরতেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল ধারালো, কিন্তু ভাষা ছিল জীবন্ত। ফলে তাঁর সাক্ষাৎকারগুলো কেবল সংবাদ হিসেবে নয়, পাঠযোগ্য গদ্য হিসেবেও টিকে আছে। অনেক সাংবাদিকতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও তাঁর সাক্ষাৎকারকে প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন নির্মাণের উদাহরণ হিসেবে পড়ানো হয়। ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার গতি বেড়েছে, কিন্তু গভীরতা সব সময় বাড়েনি। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক সাক্ষাৎকারই এখন পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকে। এই সময়ে ওরিয়ানা ফালাচির কাজ নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, একটি ভালো সাক্ষাৎকারের জন্য সাহসের পাশাপাশি দরকার অধ্যবসায়, বিস্তৃত পাঠ এবং বিষয় সম্পর্কে গভীর প্রস্তুতি। কঠিন প্রশ্ন করার সাহস জন্মায় তথ্য জানার আত্মবিশ্বাস থেকে; কেবল আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে নয়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ফালাচির অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক। এখানে বহু সাংবাদিক প্রতিকূল পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা, তথ্য যাচাই করে প্রশ্ন করা এবং সাক্ষাৎকারকে জনস্বার্থে জবাবদিহির মাধ্যম হিসেবে দেখা–এই চর্চা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। ফালাচির জীবন দেখায়, সাংবাদিকতার মূল শক্তি জনপ্রিয়তা নয়; বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় কঠিন প্রশ্ন করার নৈতিক সাহস থেকে।
২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ওরিয়ানা ফালাচির মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কাজ এখনও বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি দেখিয়েছেন, সাংবাদিকতা কেবল ঘটনাকে নথিবদ্ধ করার পেশা নয়; এটি ক্ষমতার সামনে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোরও একটি দায়িত্ব। সব সময় তাঁর সব মতের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব নয়, হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই–সাংবাদিকতা যদি প্রশ্ন করার শিল্প হয়, তবে সেই শিল্পের সবচেয়ে সাহসী শিল্পীদের একজন ছিলেন ওরিয়ানা ফালাচি।












