চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে আমদানি–রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেনারের জন্য জায়গা বাড়াতে খালি কন্টেনার বন্ডেড এরিয়ার বাইরে নন–বন্ডেড এলাকায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে নীতিগত অনুমতি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, অনুমতি মিললে বন্দরের ইয়ার্ডে খালি কন্টেনারের চাপ কমবে, অপারেশনাল কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে এবং একই অবকাঠামো ব্যবহার করে অধিক সংখ্যক আমদানি–রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেনার সংরক্ষণ ও খালাস করা সম্ভব হবে। তবে বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো (অফডক) মালিকরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, বর্তমানে অফডকগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা খালি রয়েছে। খালি কন্টেনার বন্ডেড এলাকার বাইরে রাখার অনুমতি দেওয়া হলে কাস্টমসের নজরদারি দুর্বল হতে পারে, রাজস্ব আদায়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং বন্ড ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বন্দর সূত্র জানায়, ২৬ জুলাই এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে, বন্দরের ভেতরে আমদানিকৃত সব এলসিএল (লেস দ্যান কন্টেনার লোড) এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এফসিএল (ফুল কন্টেনার লোড) কন্টেনার খুলে পণ্য খালাস করা হয়। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক খালি কন্টেনার বন্দরের ইয়ার্ডে জমা হয়। কিন্তু একই দিনে এসব কন্টেনার জাহাজে তুলে ফেরত পাঠানো বা অফডকে স্থানান্তর করা সম্ভব হয় না। ফলে খালি কন্টেনারের স্তূপ তৈরি হয়ে বন্দরের মূল্যবান ইয়ার্ড স্পেস দখল করে রাখে এবং সার্বিক অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার ধারণক্ষমতা প্রায় ৫৯ হাজার টিইইউএস। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্দরের ইয়ার্ডে মোট ৪৬ হাজার ২৩৮টি কন্টেনার ছিল। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার ছিল খালি কন্টেনার।
প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার খালি কন্টেনার বন্দরের জেটিতে অবস্থান করে বলে জানিয়েছেন বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। তিনি বলেন, খালি কন্টেনারে কোনো পণ্য থাকে না। এগুলো যদি নন–বন্ডেড এলাকায় সংরক্ষণের অনুমতি পাওয়া যায়, তাহলে বন্দরের অভ্যন্তরে বন্ডেড ইয়ার্ডের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই অবকাঠামো ব্যবহার করে আরো বেশি আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেনার রাখা সম্ভব হবে, যা বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং ব্যবহারকারীদের সেবা দ্রুততর করবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পণ্য এই বন্দর দিয়ে আমদানি–রপ্তানি হয়। বছরে ৩৫ লাখের বেশি টিইইউএস কন্টেনার এবং ১৫ কোটি টনের কাছাকাছি পণ্য এই বন্দর হ্যান্ডলিং করা হয়। ফলে ইয়ার্ডে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কন্টেনার ডেলিভারি এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।
বন্দর কর্তৃপক্ষ চিঠিতে উল্লেখ করেছে, বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে শিপিং লাইন বা মেইন লাইন অপারেটররা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বন্ড সুবিধার বাইরে খালি কন্টেনার সংরক্ষণ করে থাকে। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে বন্দরের ওপর চাপ কমবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষ হবে।
এ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক অর্থ উপদেষ্টার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, আমদানি–রপ্তানির কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার কারণে দেশে বিপুলসংখ্যক খালি কন্টেনার দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে। বিশেষ করে ২০ ফুট কন্টেনারের তুলনায় ৪০ ফুট কন্টেনারের চাহিদা বেশি হওয়ায় অনেক ২০ ফুট কন্টেনার দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকে। এছাড়া অতি বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শ্রমিক কর্মবিরতি বা অন্য কোনো কারণে কন্টেনার ডেলিভারি ব্যাহত হলে বন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। নন–বন্ডেড এলাকায় খালি কন্টেনার রাখার অনুমতি দেওয়া হলে বন্দরের সক্ষমতা ও দেশের লজিস্টিক প্রতিযোগিতা উভয় বাড়বে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, এনবিআরের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর আগে অফডক মালিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। বর্তমানে দেশের ১৯টি বেসরকারি অফডকের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টিইইউ। সেখানে বর্তমানে প্রায় ৭৮ হাজার কন্টেনার রয়েছে। অর্থাৎ এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জায়গা খালি রয়েছে। শুধু খালি কন্টেনারের সংখ্যাই প্রায় ৫৬ হাজার।
তিনি বলেন, খালি কন্টেনারও একটি বন্ডেড আইটেম। নির্ধারিত সময় ১৮০ দিনের মধ্যে শিপিং লাইন কন্টেনার ফেরত না নিলে এর ওপর শুল্ক প্রযোজ্য হয়। তাই এগুলো বন্ডেড এলাকার বাইরে সংরক্ষণ করা হলে কাস্টমস কীভাবে নজরদারি করবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তদারকির ঘাটতি হলে কন্টেনার বিক্রি বা অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধি অনুযায়ী, খালি কন্টেনার বন্ড সুবিধার আওতায় থাকা স্থান ছাড়া অন্য কোথাও সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য এনবিআরের নীতিগত অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বন্দর ব্যবহারকারী, অফডক খাত এবং কাস্টমস প্রশাসন এনবিআরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।












