পর্ব ২
আসলে রমেশ শীলই প্রথম মাইজভাণ্ডারী গানকে দরবারি মজলিশ থেকে বের করে এনে সাধারণ শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। এক্ষেত্রে তাকে লালন সংগীত–সাধক অমূল্য শাহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। অমূল্য শাহ লালন সংগীতকে তাল–মাত্রায় ফেলে গাইবার নিয়ম প্রবর্তন করেছিলেন, অনুরূপভাবে রমেশ শীলও মাইজভাণ্ডারী গানকে তাল–মাত্রায় ফেলে গাইবার পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তাই রমেশ শীলের মাইজভাণ্ডারী গানগুলো উচ্চমার্গীয় সাধনসংগীত হিসাবে রচিত হলেও তা সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
শতাব্দীকাল ধরে শতাধিক গীতিকারের প্রায় ৫ সহস্রাধিক মাইজভাণ্ডারী গান বাংলার লোকসংগীতের ধারাকে ঋদ্ধ করেছে। এ পর্যন্ত ১১৮ টি মাইজভাণ্ডারী গানের বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ৮৬টি বইয়ে গানের সংখ্যা ৪৪৮৮টি। এ ছাড়া পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত হয়েছে পাঁচটি, যাতে গান রয়েছে ৩২৮টি। সব মিলিয়ে সংগৃহীত গানের সংখ্যা ৪৮১৬টি। (সূত্র–আঞ্জুমানে মোত্তাবিয়ানে গাউছে মাইজভাণ্ডারী সাংস্কৃতিক পরিষদ)।
প্রসঙ্গত, ড. সেলিম জাহাঙ্গীর রচিত ‘গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে’ গ্রন্থে মাইজভাণ্ডারী গানের ৮৫ জন রচিয়তার সন্ধান দেওয়া হয়েছে।
’৭০ এর দশকে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায় তার ছায়া রয়েছে মাইজভাণ্ডারী গানেও। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম বেতার– টেলিভিশনে এই গানের সুর ও উপস্থাপনাতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সংগীতের বাণিজ্যিকীকরণেও মাইজভাণ্ডারী গান প্রাধান্য পেতে থাকে। তবে বেতার–টেলিভিশন ও ক্যাসেটে মাইজভাণ্ডারী গানের গায়কী ও ঢং নিয়ে দরবারের ধারকরা অসন্তুষ্ট হন। তাদের কথা এতে সাধন–সংগীতের মেজাজ ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। এ প্রসঙ্গে মাইজভাণ্ডারের আওলাদ সৈয়দ দিদারুল হকের মন্তব্য-‘মাইজভাণ্ডারী গান নিয়ে ফকির আলমগীর, ফিরোজ সাঁই এরা আনন্দ করে, মাইজভাণ্ডারী গান তামাশা করার বিষয় নয়।’ (সূত্র–গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে–ড. সেলিম জাহাঙ্গীর)।
এবার প্রশ্ন, মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব হয়েছিল কীভাবে?
১৩৬৫ বাংলা সনে ‘আল মাইজভাণ্ডারী’ পত্রিকায় মৌলবী বজলুর রহমান বিএবিটি ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ প্রবন্ধে মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরীকেই এ গানের উদ্ভাবক বলে অভিহিত করেছেন। মাওলানা শাহসুফী সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী লিখিত ‘গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর জীবনী ও কেরামত’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ‘সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর সামনে বসে গায়ক গুরুদাস ফকির নামে এক ভক্ত খঞ্জরি বাজিয়ে বৈরাগী সুরে তাকে গান শুনাতেন।’ এই গুরুদাস ফকির ছিলেন ঊনিশ শতকের একজন সন্নাসী।
মাইজভাণ্ডারী গানের ক্রমবিকাশের ধারাকে তিন পর্বে ভাগ করা যায়–উদ্ভব পর্ব, বিকাশ ও সমৃদ্ধি পর্ব।
ক. উদ্ভব পর্ব–মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (১৮২৬–১৯০৬) শানে রচিত গান।
খ. বিকাশ পর্ব–সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর ভ্রাতুস্পুত্র ও খলিফায়ে আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারীকে (১৮৬৫–১৯৩৭) কেন্দ্র করে রচিত গান।
গ. সমৃদ্ধি পর্ব–সামপ্রতিকালে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন (১৮৯৩–১৯৮২), সৈয়দ শফিউল বশর, সৈয়দ জিয়াউল হকসহ (১৯২৮–১৯৮৮) গদীনসীন পীরদের শানে রচিত গান।
উদ্ভব পর্ব : উদ্ভব পর্বে বাদ্যযন্ত্র ছিল খঞ্জরি ও জুরি। তাল রক্ষার জন্য গানের সাথে হাততালি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এই পর্বের প্রধান রচয়িতা হলেন মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, মওলানা আবদুল গণি, মওলানা বজলুল করিম মন্দাকীনি, মনমোহন দত্ত, আবদুল্লাহ বাঞ্চারামপুরী ও রায়হান প্রমুখ। আস্কর আলী পণ্ডিত ও খায়েরজ্জামা পণ্ডিতের কিছু গানও মাইজভাণ্ডারী ভাবধারায় পুষ্ট। আস্কর আলী পণ্ডিতের একটি গানে গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর কথা আছে।
আমার মুর্শিদ কেমন জনা
দরশন পাইবে করিলে ভাবনা।
চট্টগ্রামের পটিয়াতে সাতবাড়িয়া আছে
সাতবাড়িয়া গেলে দেখ ঢাকা–দিল্লি কাছে।
সরিয়তের চারি পীর চৌদ্দই খান্দান
ভোব গুরু মওলানা ফজল রহমান।
এ চারি খান্দান পীরর খেলাফতি রাখে
আহমদোল্লাহ মওলানার ওরছ করি থাকে।
(আস্কর আলী পণ্ডিত : একটি বিলুপ্ত অধ্যায়, শামসুল আরেফীন)
উপরিউক্ত গানটি সংকলিত হয়েছে আস্কর আলী পণ্ডিতের ‘হাফেজ বাহাদুর’ গ্রন্থে। প্রসঙ্গত, সাতবাড়িয়া দরবারের সুফি সাধক হাফেজ বাহাদুর ছিলেন পণ্ডিতের পীর। অন্যদিকে, হাফেজ বাহাদুর হলেন গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর খলিফা।
উদ্ভব পর্বের মওলানা আবদুল হাদী রচিত গানটি মাইজভাণ্ডারের সূচনা–সংগীত হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
দমে দমে জপরে মন লা ইলাহা এল্লাল্লা
ঘটে ঘটে আছে জারি লা ইলাহা এল্লাল্লা॥
মঞ্জেলে মঞ্জেলে মন গাউছ ধনের সিংহাসন
হাদীরে তলকিন করে লা ইলাহা এল্লাল্লা॥
খ. বিকাশ পর্ব : বিকাশ পর্বে মাইজভাণ্ডারী গানের প্রধান রচয়িতা হলেন রমেশ শীল। ওই পর্বের দিকপাল শিল্পী হলেন মোহাম্মদ নাসির ও টুনু কাওয়াল। এবং এই সময়েই সাধনমার্গের স্বীয় সীমাবদ্ধ গণ্ডি অতিক্রম করে লোকসংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠে মাইজভাণ্ডারী গান। রমেশ শীলের একটি গান :
‘দিন দুনিয়ার মালিক বাবা মাওলানা
এই ভুবনে দিতে নারে তুলনা॥
বাবা–নিজে বাদশা, নিজে কাজী, নিজে নৌকা নিজে মাঝি
নিজের ভাবে নিজে রাজি মাওলানা॥’
(আশেকমালা–রমেশ শীল)
সমৃদ্ধি পর্যায় : এই পর্বে মাইজভাণ্ডারী গানের রচয়িতারা হলেন, আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতার, সঞ্জিত আচার্য্য, ফরিদ হোসেন, নজরুল ইসলাম সাধকপুরী, সৈয়দ মহিউদ্দিন, মাহবুব উল আলম, ইউনুস আলকরণী প্রমুখ।
মাইজভাণ্ডারী গানের মহান রচয়িতাদের মধ্যে ব্যতিক্রমী কিছু বিশেষত্ব দেখা যায়। যেমন মওলানা হাদীর গানে রয়েছে বিচ্ছেদ, মওলানা বজলুল করিমের গানে শেকোয়া বা অভিযোগের সুর এবং রমেশ শীলের গানে প্রেমাবেগই প্রধান।
মওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনির শেকোয়ামূলক একটি মাইজভাণ্ডারী গান :
‘আমি কি তোমার গোলাম নই
আমি কি তোমার গোলাম নই
হ’লে কেন এই জগতে এত জ্বালা সই॥’
(প্রেমের হেম–বজলুল করিম মন্দাকীনি)
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মাইজভাণ্ডারী গান রচনার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হলেন আবদুল গফুর হালী। আঞ্চলিক ভাষায় হালী রচিত একটি গান :
অধর কথা কই দিয়ম
বেশি গইল্যে বারাবারি,
বেকুপর মাষ্টর অডা
তুই কি বুঝিবি মাইজভাণ্ডারী॥
(শিকড়, আবদুল গফুর হালী, সুফী মিজান ফাউন্ডেশন)
বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূল থেকে উদ্ভূত বলে মাইজভাণ্ডারী তরিকার যাবতীয় কর্মকাণ্ড বাংলা ভাষায়, ক্ষেত্রবিশেষে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সম্পাদিত হয়ে আসছে। বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসরণ করেই মাইজভাণ্ডারের বার্ষিক ওরশ ও খোশরোজ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। ১০ মাঘ গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশ (১৯০৭ সাল থেকে) অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৩৮ সাল থেকে বাবা ভাণ্ডারীর ওরশ হয়ে আসছে ২২ চৈত্র। ১৯৭১ সালে মাইজভাণ্ডারের প্রকাশ্যে অবস্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই। গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর প্রপৌত্র শাহানশাহ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর রওজা শরীফের নির্মাণ–স্থাপত্যে ব্যবহৃত হয়েছে জাতীয় ফুল শাপলা।
মাইজভাণ্ডারী দর্শন অসামপ্রদায়িক চেতনা ও মানবধর্মের মাহাত্ম্য দ্বারা পরিচালিত বলে মাইজভাণ্ডারী গানও জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি তথা বিশ্বমানবের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষুধা নিবারণ করছে। তাই মাইজভাণ্ডারী গান আজ বাংলা লোকসংগীতের অপরূপ ধারা, যা একান্তই চট্টগ্রামের নিজস্ব সম্পদ। মাইজভাণ্ডারী গান চাটগাঁইয়া সংস্কৃতির প্রেমপুষ্প, যার সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজোড়া।
লেখক : সাংবাদিক ও লোকসংগীত গবেষক











