প্রবেশনের শর্ত ভঙ্গ করছেন এক-পঞ্চমাংশ

প্রবেশন অফিসারের পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিকেও তদারকিতে যুক্ত করার পরামর্শ

হাবীবুর রহমান | মঙ্গলবার , ২৮ জুলাই, ২০২৬ at ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ

সমাজের স্বাভাবিক পরিবেশে রেখে প্রথম ও লঘু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে সংশোধনের সুযোগ দিতে আদালত প্রবেশনে পাঠান। প্রবেশনকালে তাদের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন শর্ত। অনেকেই এসব শর্ত মেনে চললেও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তা ভঙ্গ করছেন। চট্টগ্রাম মহানগর প্রবেশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া প্রবেশন মামলাগুলোর মধ্যে প্রায় ২১ শতাংশে শর্ত ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে অপরাধীকে কারাগারে না পাঠিয়ে সমাজে রেখে সংশোধনের যে উদ্দেশ্যে প্রবেশন দেওয়া হয়, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তি শর্ত ভঙ্গ করলে আদালত শুনানি শেষে তার প্রবেশন বাতিল করতে পারেন। একই সঙ্গে যে দণ্ড স্থগিত রেখে তাকে প্রবেশনে পাঠানো হয়েছিল, সেই দণ্ড কার্যকরের আদেশ দিতে পারেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–৪–এ প্রবেশন অফিসের দাখিল করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জিআর মামলা নং–৫৫/২০২১–এর আসামি গোলাম মোস্তফা জামশেদ এক বছরের প্রবেশন পান। তার অন্যতম শর্ত ছিল মাদক সেবন না করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডোপ টেস্টের ফলাফল দাখিল করা। গত ১৯ জানুয়ারি তিনি প্রবেশন অফিসে ডোপ টেস্টের ফলাফল জমা দেন। প্রতিবেদনে দেখা যায়, তার মূত্রে ইয়াবার উপাদান পাওয়া গেছে, যা শর্ত ভঙ্গের প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রবেশন অফিসের আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জিআর মামলা নং–৯৮/২০২৫–এর আসামি আকলিমা, সাথী, দুলাল ও সুজনকে এক বছরের প্রবেশনে পাঠানো হয়। তাদের মাদক–সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং প্রবেশন অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাসহ বিভিন্ন শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রবেশন আদেশের পর তারা কেউই প্রবেশন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। ফোন করেও তাদের পাওয়া যায়নি। সরেজমিনে গিয়ে আকলিমা ও সাথীর বাড়ি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে এবং মা–মেয়ে উভয়ই মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। এসব তথ্যও আদালতে প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর প্রবেশন অফিস জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে মহানগরের আদালতগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রবেশন আদেশ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ বছর চার মাসে ২১৭ জনকে প্রবেশনে পাঠানো হলেও, ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ৩৮ মাসে প্রবেশনপ্রাপ্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২২৭ জনে। বর্তমানে মহানগরের আদালতগুলো থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জন অপরাধী প্রবেশনের সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রবেশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩৮ মাসে প্রবেশনপ্রাপ্ত ১ হাজার ২২৭ জনের মধ্যে ২১৭ জন সফলভাবে প্রবেশন সম্পন্ন করেছেন। একই সময়ে ৫৭ জন শর্ত ভঙ্গ করেছেন এবং তাদের বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে ৯৫৩ জনের প্রবেশন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অর্থাৎ, এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ২৭৪টি প্রবেশন মামলার মধ্যে ৫৭টিতে শর্ত ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে, যা প্রায় ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ।

প্রবেশন অফিস আরও জানায়, ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরে মোট ১ হাজার ৫০৩ জন প্রবেশনপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫১১ জন সফলভাবে প্রবেশন সম্পন্ন করে অব্যাহতি পেয়েছেন।

প্রবেশন অফিসার মনজুর মোরশেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, আদালতের দেওয়া প্রবেশন আদেশ যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করাই প্রবেশন অফিসের দায়িত্ব। সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে নিয়মিত আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে। কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে সেটিও আদালতের নজরে আনা হচ্ছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালত গ্রহণ করেন।

তিনি বলেন, আদালত শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রবেশন বাতিল করে পূর্বে স্থগিত রাখা দণ্ড কার্যকরের আদেশ দিতে পারেন। তবে সবাই এক রকম নন। অনেকেই সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন, আবার কেউ কেউ সেই সুযোগ গ্রহণ করেন না।

মানবাধিকারকর্মী ও সিনিয়র আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান আজাদীকে বলেন, প্রবেশন একটি কার্যকর ব্যবস্থা। এটি আরও বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করা গেলে কারাগারের ওপর চাপ কমবে। তার মতে, প্রবেশন অফিসারের পাশাপাশি স্থানীয় কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তিকেও তদারকিতে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তি সামাজিকভাবে আরও জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন এবং শর্ত ভঙ্গের প্রবণতা কমবে। তিনি বলেন, অপরাধী যাতে পরিবারের সঙ্গে থেকে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ পান, সে লক্ষ্যেই প্রবেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে শর্ত ভঙ্গের ঘটনাগুলো দেখায়, সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধনগরীর ৪১ ওয়ার্ডে ওএমএসের চালের বরাদ্দ বেড়ে দ্বিগুণ