প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

লুৎফুন নাহার | মঙ্গলবার , ২১ জুলাই, ২০২৬ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ

বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। আর এই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক ও শিশুদের নিয়ে অবশ্যই পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে প্রথমেই যে বিষয়টি বিবেচনা করে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন তা হল, ‘প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য’। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পঞ্চম শ্রেণীর শেষে শিক্ষার্থীদের কিছু যোগ্যতা অর্জন করতে হয়, যেগুলোকে বলা হয় প্রান্তিক যোগ্যতা। জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য ১০টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুদের জন্য নির্ধারিত এই ১০টি প্রান্তিক যোগ্যতাকে শিশুর মধ্যে প্রোথিত করতে তিনজন ব্যক্তিকে একই সুতোয় গাঁথতে হবে। তাঁরা হলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক।

সকলের সান্নিধ্য লাভ : প্রতিটি যোগ্যতায় শিশুর সাথে সমাজের সকলের সাথে মেলবন্ধন ঘটে।

শিশুর ভয় দূরীকরণ : একমাত্র শিশুবান্ধব শিক্ষকই শিশুকে শেখাবে আনন্দের সঙ্গে, ভয় ভীতির উর্ধ্বে রেখে এবং দূর করবেন সকল শিখন ঘাটতি। এভাবেই শিশু উৎসাহিত হবে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে।

অভিভাবকদের কাজের সীমারেখা : অভিভাবকদেরকে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ ও সফলতা অর্জনের উদ্দেশ্যে শিক্ষককে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। কি পড়ানো হলো, বাড়ির কাজ কি দিল তা জানতে শিক্ষকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।

শিক্ষকদের দায়িত্ব : বছরের শুরুতে শিশু ভর্তি হতে শুরু করে ৩য় প্রান্তিকের ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ে যথেষ্ট পরিশ্রম করেন শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নে।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ : বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বই সরবরাহ, মিডডেমিল ব্যবস্থা, মাসিক উপবৃত্তির ব্যবস্থা ও বিনা বেতনে শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। বর্তমান সরকার শিশুদের জন্য ইউনিফর্ম, ব্যাগ ও জুতা সহ নানান শিখন সামগ্রী প্রদানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গৃহীত উদ্যোগ : এনএপিই ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ তদারকিতে প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষণ ঘাটতি দূরীকরণের জন্য ওয়ানটুওয়ান এপ্রোচে বেইজ লাইন সার্ভে বা জরিপ করে শিশুর শিখন অগ্রগতি যাচাই করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় এবং তা বাস্তবায়নে এখনো বিভিন্ন শিখন কৌশল বা গৃহীত পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে কিছু প্রস্তাবনা : মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে বেশ কিছু সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। শিক্ষকদের নন প্রফেশনাল কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। নতুবা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে সঠিক ও সফল পাঠদানে ব্যর্থ হবে এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জন করানো দুরূহ হবে। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরনের পরিকল্পনা বছরের ঠিক শুরু হতেই কার্যকর করতে হবে। শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির সময়কাল হ্রাস করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের শিশু ও শিক্ষকের নিরাপত্তা : শিশু ও শিক্ষকবান্ধব পরিবেশ এবং বিদ্যালয়ের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুমের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে।

গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো : কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি সুন্দর সমাজ গঠনে ও পরিচালনায় শারীরিক ও মানসিক শিক্ষা, শিল্পকলা, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, দেশীয় খেলা ও সংস্কৃতির অধিক চর্চা করা প্রয়োজন। শিশুদের মোবাইল ফোনের উপর আসক্তি কমাতে বিশেষ পরামর্শ দিতে হবে। শিশুর সুস্বাস্থ্যের উপর নজর রাখতে হবে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পারস্পরিক সম্পর্ক : বিদ্যালয়ের উন্নয়নে শিক্ষকদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রাখতে হবে। বিদ্যালয়ের মান সম্মত পরিবর্তনে সহকারী শিক্ষকদের পরস্পরের সাথে সম্পর্ক এবং সহকারীদের সাথে প্রধান শিক্ষকের সুসম্পর্কটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

বর্তমান সময়ের উদ্যোগ এফএলএন বা ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমেরেসি (মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যা জ্ঞান) : এ পদ্ধতিতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিশুদের বাংলা, গণিত ও ইংরেজির অর্জিত দক্ষতা যাচাই করা হয়। সহজ কথায়, একটি শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শেষ নাগাদ পড়তে, লিখতে এবং সাধারণ গণিত সমাধান করতে পারার দক্ষতাই হলো এফএলএন।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান : শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রয়োগ, পাঠদানের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার কৌশল বা মূল্যায়নের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, এ কার্যক্রমগুলো সংশ্লিষ্ট সকলের তৎপরতায় সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বা অন্তরায়গুলোর উত্তরণে একদিন আমরা প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারবো। লেখক : সহকারী শিক্ষিকা, নিউ টাইগারপাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিপন্ন মানবতা : সভ্যতার আড়ালে যেন হিংস্রতা
পরবর্তী নিবন্ধবন্যা-পরবর্তী কৃষির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে করণীয়