অনলাইন প্ল্যাটফর্ম : অর্থনৈতিক মুক্তি নাকি নৈতিক সংকট

কুমুদিনী কলি | শনিবার , ১৮ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

যুগের আধুনিকায়নের সাথে সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নানা উপকরণের সাথে সাথে মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার এখন তুঙ্গে। মোবাইল ফোনের মধ্যেও এখন আর সেই বাটন মোবাইলের দিন শেষ।

সেখানে নানা প্রকারের এন্ড্রয়েড ফোনে দেশ সয়লাব। ধারাবাহিক ভাবে ফোনের ব্যবহার এবং সহজলভ্যতার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ফোনের রকমারি ব্যবহার বেড়েছে করোনা পরবর্তী বাংলাদেশে। আমাদের এমন একটি সময়ের মধ্যে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছে করোনার সময়ে, যখন প্রতিটি বিষয়ের জন্য অনলাইনে যুক্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না।

মূলত আধুনিক বাংলাদেশে অনলাইনের বিস্তৃতি করোনার সময় থেকেই। এরপর আর এদেশের মানুষ অনলাইনের থাবা থেকে বের হতে পারেনি। আমরা অনলাইনে নির্ভরশীল হয়ে গেলাম পাকাপোক্তভাবে। এরপর থেকেই নানামুখী ব্যবহারে অনলাইনের ব্যাপকতা বাড়তে বাড়তে ইদানীং তা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

অনলাইন বা ইন্টারনেটের নানামুখী ব্যবহার রয়েছে। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে অনলাইনকে ব্যবহার করে যাচ্ছে। ঘরে বসেই বাড়তি আয়ের চমৎকার এক উৎস এই মাধ্যম। প্রথমদিকে পুরুষ মানুষের আগ্রহ এবং অংশগ্রহণ ছিলো এই ক্ষেত্রে বেশি। কিন্তু বর্তমানে মেয়েরা এত বেশি এগিয়ে এসেছে এই প্ল্যাটফর্মে যে পুরুষের চেয়ে নারীরা কয়েকগুণ এগিয়ে গেছে। বেশির ভাগ মেয়েরা তাদের আয়ের উৎস হিসেবে অনলাইন প্লাটফর্মকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা ঘরে বসেই বিভিন্নভাবে, নানা কাজের মাধ্যমে আয় করতে সক্ষম হচ্ছে। এমনকি যারা ভেবেছিলো, কেনোদিন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হবে না, তারাও বিভিন্নভাবে অর্থ উপার্জনে সক্ষমতা পাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির একটি ভালো দিক এবং আশার কথা এটি যে, ঘরের অন্য সদস্যরা অথবা হাজবেন্ড এই ক্ষেত্রে চমৎকারভাবে সাহায্য করছে গৃহিণীকে। এই বিষয়টা বেশ আশাপ্রদ। এতে করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে মহিলাদের। তাদের রোজগারের একটি নিজস্ব উৎস তৈরী হয়েছে। অনলাইন বা ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরে বসেই যে কেউ কাপড়, প্রসাধন বা বিভিন্ন প্রকারের দ্রব্য ক্রয় বিক্রয় করতে পারছে। কেউ হোম ডেলিভারিতে খাবারের ব্যবসা করছে। কেউ বা আবার সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কেউ কেউ সেলাই শিখছেন। কেউ অনলাইনে কোচিং সেন্টারের মতো ক্লাস নিচ্ছে সরাসরি, আবার সেই ক্লাসের ভিডিও আপলোড করছে। মোটকথা ইন্টারনেটের নানাবিধ ব্যবহারে মানুষ নিজেদের নিয়োজিত করতে পারছে নানা মাধ্যমের পেশায়। তাতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরী হচ্ছে।

মহিলারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে, অবসর সময়ে নানা রকম ভিডিও তৈরী করছে। এছাড়াও কেউ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কোনো ভিডিও বানিয়ে সেটা আপলোড করছে, নতুবা গান গাইছে। গানের নিত্য নতুন ভিডিও আপলোড করে ফেসবুক থেকে টাকা আয় করছে। ইন্টারনেটে নানারকম ভিডিও বানিয়ে কেউ কেউ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হচ্ছে বা টিকটকে ভিডিও বানাচ্ছেন। অথবা, ছোটো ছোটো বাচ্চাদের নিয়ে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরছেন সকলের সামনে। ছোটো বাচ্চাদের এসব ভিডিও করার জন্য ভিডিওর প্রচার এবং প্রসার দুটোই বাড়ছে। কারণ স্বাভাবিক ভাবেই ছোটো বাচ্চাদের সব কিছুই বেশ আকর্ষণীয়। নিজের ছোটো শিশুর শৈশবকালীন স্মৃতিকে ধরে রাখতে অনেকেই ভিডিও করে সেসব সংরক্ষণ করে রাখতে চায় এবং একটা সময় এসব ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করতে করতে তিনি হয়তো ফেসবুক থেকে মনিটাইজেশন পেয়ে গেলেন।

এতে করে টাকা আয় করা শুরু হলে অনেকেই এতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। আর শুরু হয় নতুন একটি উপার্জনের ক্ষেত্র। রান্নার ভিডিওর মধ্যে দিয়ে রান্নার ব্যাপকতা বাড়ছে দিনদিন। এক জায়গার লোক আরেক জায়গার রান্নার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারছে। এতে করে সীমাবদ্ধতা দূর হয়ে স্থানীয় থেকে এসব পদ ছড়িয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে।

শুধুমাত্র রান্না কেনো, সব বিষয়েই স্থান কালের ব্যবধান ঘুচে গিয়ে যোগাযোগ বা আদান প্রদানের মাধ্যমে একটা সুন্দর সুযোগ তৈরী হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই সময়ে এসে এটি বেশ প্রগতিশীল ভূমিকা রাখছে প্রচার এবং প্রসারের ক্ষেত্রে। এতে করে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপন বা নিজের সৃষ্টি, সৃজনশীলতা, কালচার সকলের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়, আর তাতে করে নিজেদের গন্ডি পেরিয়ে নিজেদের কাজগুলোকে সবার কাছে প্রকাশের একটি বিশাল সুযোগ তৈরী হয়। এটি নিঃসন্দেহে ভীষণ ভালো একটি দিক। ঘরে বসেই একটি মুঠোফোনের মাধ্যমে যদি কাজের এমন বিস্তৃত পরিধি গড়ে ওঠে, তবে তা নিশ্চয়ই প্রযুক্তির একটি অনন্য দিক।

কিছু কিছু দক্ষ ও অভিজ্ঞ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা পরিচিত মুখ বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভিডিওর মধ্য দিয়ে। তাঁদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও তথ্যবহুল ভিডিও বা দিকনির্দেশনা ব্যক্তি তথা সমাজের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। অনেকেই বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকছেন এই অনলাইন প্লাটফর্মে। শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ অনলাইনে কোচিং করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্টুডেন্টরা চাকরির বদলে এসব কোচিং সেন্টারগুলো অনলাইনে পরিচালনা করছে। এটা অবশ্যই অনলাইন প্লাটফর্মের ভালো দিক।

কিন্তু সমস্যা হলো প্রযুক্তির অপব্যবহার। বাচ্চাদের দিয়ে ভিডিও বানিয়ে বেশি বেশি জনপ্রিয়তা পাবার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরী হচ্ছে নিজের মধ্যে, তা সন্তানদের মধ্যেও প্রকাশিত হচ্ছে। এতে করে এই বাবা মায়ের সন্তানেরা ভিডিও বানানো, তা আপলোড দেয়া, লাইক কমেন্ট চেক করার মাধ্যমে ফেসবুক মনিটাইজেশন পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। এতে করে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে পড়াশোনার। তাদের নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। কিছু কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়েকে দিয়ে এমন কিছু আপত্তিকর বিষয়ের ওপর তাদের অভিভাবকগণ ভিডিও করান, সেসব সেই বয়সী শিশুদের তা বুঝতে পারার কথা নয়। এদেরকে দিয়ে ভিডিও করানোর এই যে অভ্যেসটা বাবা মা শুরু করান, এতে করে শিশুরা এই ভার্চুয়াল জগতের সাথেই অভ্যস্ত হওয়া শুরু করে। শিশুদের যে আলাদা একটা জগৎ, ধীরে ধীরে সবটা রপ্ত করার ধারাবাহিকতা, সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিশুদের শিশুতোষ কাজের সাথে যুক্ত রাখার প্রচেষ্টা করা প্রয়োজন। অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ, পরিণত বয়সী হয়ে শিশুদের অভিনয় করানো, অমার্জিত পোশাক, অশ্লীল ভঙ্গিতে কথা বলানো এসব কোনোভাবেই শিশুতোষ চিন্তা ভাবনার বহিঃপ্রকাশ নয়। তাদের অভিভাবকদের বুঝতে হবে বিষয়টা। স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে দিনশেষ ভুগতে হবে নিজেদেরই।

সন্তান কোথায় কার সাথে মিশছে, সে কতটুকু আয়ত্ত করছে সেটা বাবা মায়ের নজরদারির মধ্যে থাকা উচিত। অন্য কারোর ফোন নিয়ে সে এই ধরনের কোনো ভিডিও আপলোড করছে কিনা তার খোঁজ রাখা অভিভাবকদের দায়িত্ব। ফেসবুক থেকে সে কত টাকা আয় করছে, তার ব্যাপার স্যাপার কী এসব নিয়ে ভিডিও বা টিকটক করা শিশুরা চূড়ান্ত জ্ঞানী। তার কথা বলার ভঙ্গি এবং চাতুর্য কোনোটাই বয়সের উপযোগী নয়। সংস্কৃতির এই বাজে ধারা থেকে শিশু কিশোরদের বের করে আনা প্রয়োজন। অনলাইনের সঠিক ও উপযুক্ত প্রয়োগে যেমন সবটা সহজ থেকে সহজতর হয়, তেমনি এর বাজে দিকটা নিয়ে যদি সঠিক সময়েই সচেতন হওয়া না যায়, তবে এর মরণকামড় সমাজকে ধ্বংস করে দেবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরিবর্তন মানে জীবনের খেয়ানৌকার হালটা শক্ত করে ধরা
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম শহর উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ