দুই মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে দুর্ভোগে নন-এমপিও ও খণ্ডকালীন শিক্ষক-কর্মচারীরা

পাহাড়তলী কলেজ

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

পাহাড়তলী কলেজের ননএমপিও ও খণ্ডকালীন শিক্ষককর্মচারীরা টানা দুই মাস ধরে বেতনভাতা না পেয়ে চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একই সঙ্গে কলেজ থেকে প্রদেয় বিভিন্ন ভাতা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন ননএমপিওভুক্ত শিক্ষককর্মচারীরা। মে ও জুনএই দুই মাসের বেতনভাতা বন্ধ থাকায় শিক্ষককর্মচারীদের অনেকেই পরিবারপরিজন নিয়ে আর্থিক দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকের বাসা ভাড়া বকেয়া হয়ে গেছে, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সূত্র জানায়, এমপিও ও ননএমপিও শিক্ষককর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধের জের ধরেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৬৪.০১.০০১.১৮২৪৫ অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষককর্মচারীরা ১ জুলাই ২০১৮ সাল থেকে সরকারি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি পেলেও গভর্নিং বডির অনুমোদন ছাড়াই একই সময় থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত কলেজ তহবিল থেকেও অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি গ্রহণ করে আসছিলেন। শুধু তাই নয়, ওই অতিরিক্ত অর্থ সরকারি মূল বেসিকের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন বেসিক নির্ধারণের মাধ্যমে তার ভিত্তিতে ১০ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং ৩৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষককর্মচারীরা সরকারি সুবিধার পাশাপাশি কলেজ থেকেও অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা ভোগ করলেও ননএমপিও শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এমপিওভুক্তরা যেখানে ১০ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড সুবিধা পেয়েছেন, সেখানে ননএমপিও শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। একইভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা সরকারি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়ার পাশাপাশি কলেজ থেকে অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া পেলেও ননএমপিও শিক্ষকরা পেয়েছেন মাত্র ১৫ শতাংশ। এছাড়া প্রভাষক পদমর্যাদার ননএমপিও শিক্ষকদের সরকার ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত নবম গ্রেডের পরিবর্তে দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ননএমপিও শিক্ষকরা বর্তমান গভর্নিং বডির সভাপতি ও বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক আতাউল হক ভূঁইয়ার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান। এর আগে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সভাপতি শফিকুর রহমানের কাছেও একই ধরনের আবেদন করা হলেও দীর্ঘ সময়েও বিষয়টির কোনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ননএমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা মাউশির পরিচালক বরাবরেও একই অভিযোগ করেছেন।

বর্তমান সভাপতি অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে কলেজের আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একাধিক প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এপ্রিল ২০২৬ মাসের বেতনভাতার বিল অনুমোদনের সময় তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষককর্মচারীদের কলেজ থেকে গৃহীত অতিরিক্ত বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি এবং অধ্যক্ষের দায়িত্ব ভাতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।

এ সিদ্ধান্তের পর অধ্যক্ষসহ এমপিওভুক্ত শিক্ষককর্মচারীদের একাংশ নিজেদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ননএমপিও ও খণ্ডকালীন শিক্ষককর্মচারীদের অনুমোদিত বেতনভাতার বিলও সভাপতির কাছে উপস্থাপনে বাধা সৃষ্টি করেন বলে চিঠিগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি সভাপতির নজরে এলে তিনি গত ২৫ জুন প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দিয়ে কলেজের সকল শিক্ষককর্মচারীর উদ্দেশে একটি অফিস আদেশ জারি করেন। তবুও মে মাসের বেতনভাতা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

পরবর্তীতে ৩০ জুন অনুষ্ঠিত গভর্নিং বডির সভায় ২০১৭ সাল থেকে অদ্যাবধি কলেজের সব আর্থিক লেনদেন একটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অডিট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সভায় শিক্ষককর্মচারীদের ক্ষেত্রে সরকারি বেসিকের ভিত্তিতে ১০ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং ৩০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া প্রদানের সিদ্ধান্তও অনুমোদিত হয়। সভার কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্ত অধ্যক্ষের কাছে পাঠানো হলেও সভাপতির নির্দেশনা অনুযায়ী এখনো বেতনভাতার বিল প্রস্তুত করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে সম্পূর্ণ কলেজের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল ননএমপিও ও খণ্ডকালীন শিক্ষককর্মচারীরা টানা দুই মাস ধরে বেতনভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

এদিকে কলেজের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ও ৭ জুলাই দুটি তদন্ত দল কলেজে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের পক্ষ থেকেও ৭ এপ্রিল একটি পৃথক তদন্ত পরিচালিত হয়েছে।

গতকাল কলেজের একাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সাথে কথা বলা হলে তারা জানান, আমাদের প্রাপ্য অংশ আমরা পাচ্ছি। আমরা তো কারো ভাগের টাকা কেড়ে নিচ্ছি না। আমরা কারো প্রাপ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছি না। যার যা ন্যায্য প্রাপ্ত তা তারা পেলে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু এমপিওভুক্ত ও ননএমপিওভুক্ত শিক্ষক তো সমান সুযোগ সুবিধা পাবেন না। কিছু তো কম বেশি থাকবে। এটা মেনে নিতে না পেরে ননএমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা সমস্যাটি তৈরি করেছেন বলেও তারা জানান।

কলেজের ননএমপিও ও খণ্ডকালীন শিক্ষককর্মচারীরা দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, গভর্নিং বডির গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং তাদের দুই মাসের বকেয়া বেতনভাতা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারের সাথে গতকাল যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কিছু ভুল বুঝাবুঝির কারণে সমস্যা হয়েছে। কাল পরশুর মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবন্যাকবলিত ১১ জেলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল
পরবর্তী নিবন্ধসরকারি হলো থানচির আলোচিত তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়